এটিএম কীভাবে আবিষ্কার হলো, ব্যাংকিং পরিষেবা মানুষের হাতের কাছে ২৪ ঘণ্টা পাওয়ার ঐতিহাসিক যাত্রা
এটিএম আবিষ্কারের ইতিহাস ও ২৪ ঘণ্টার ব্যাংকিং সেবার সূচনা
ব্যাংকে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা তোলার সেই ঝক্কিঝামেলাপূর্ণ দিনগুলো আজ প্রযুক্তির কল্যাণে অনেকটাই অতীত। ছুটির দিন হোক কিংবা মাঝরাত—হাতের কাছে থাকা প্লাস্টিক কার্ডটি নিয়ে যেকোনো সময় নিকটস্থ বুথে গিয়ে নিজের প্রয়োজনমতো নগদ টাকা তুলে নেওয়ার এই অবিশ্বাস্য স্বাধীনতা আমাদের উপহার দিয়েছে এটিএম (ATM) বা অটোমেটেড টেলার মেশিন। মানুষের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া এই স্বয়ংক্রিয় ক্যাশ মেশিন আবিষ্কারের পেছনের ইতিহাসটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও কৌতূহলোদ্দীপক।
এটিএম বা ক্যাশ মেশিন তৈরির মূল ভাবনাটি এসেছিল জন শেফার্ড ব্যারন (John Shepherd-Barron) নামের এক স্কটিশ উদ্ভাবকের মাথা থেকে। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামা সময়ে ব্যারন একদিন ক্যাশ টাকা তোলার জন্য ব্যাংকে একটু দেরিতে পৌঁছান এবং ব্যাংক বন্ধ থাকায় চরম বিপাকে পড়েন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মাথায় এমন একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র তৈরির আইডিয়া আসে, যা চকোলেট ভেন্ডিং মেশিনের মতো ২৪ ঘণ্টা গ্রাহককে নগদ টাকা প্রদান করতে পারবে। তাঁর এই দূরদর্শী ধারণার ওপর ভিত্তি করে ১৯৬৭ সালের ২৭ জুন লন্ডনের বারক্লেজ (Barclays) ব্যাংকের একটি শাখায় বিশ্বের প্রথম কার্যক্ষম এটিএম বুথ চালু করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ১৯৬৭ সালে জন শেফার্ড ব্যারন যুক্তরাজ্যের বারক্লেজ ব্যাংকে বিশ্বের প্রথম এটিএম স্থাপন করেন, যেখানে পেপার ভাউচার ব্যবহার করে টাকা তোলা হতো এবং চার অঙ্কের পিন (PIN) নম্বর ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়।
- প্রাথমিক আমলের এটিএমগুলোতে পাসওয়ার্ড বা পিন হিসেবে ৪ অঙ্ক ব্যবহার করার প্রচলন শুরু হয়, কারণ ব্যারন প্রথমে ৬ অঙ্কের পিন রাখতে চাইলেও তাঁর স্ত্রী কেবল ৪টি সংখ্যা মনে রাখতে পারবেন বলে এটি ঠিক করে দেন।
- ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ম্যাগনেটিক স্ট্রাইপ কার্ড এবং সেন্ট্রাল ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক যুক্ত হওয়ার ফলে এটিএম সারা বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
- আধুনিক যুগে এসে বায়োমেট্রিক স্ক্যানার, ফেসিয়াল রেকগনিশন, কন্টাক্টলেস ক্যাশ উইথড্রয়াল এবং উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে এটিএম সেবা আরও বেশি আধুনিক ও নিরাপদ হয়েছে।
আধুনিক যুগে এটিএম প্রযুক্তির রূপান্তর ও প্রভাব
জন শেফার্ড ব্যারন সেই আদি পেপার ভাউচার ও টোকেনভিত্তিক মেশিন থেকে শুরু করে আজকের মাল্টি-ফাংশনাল ডিজিটাল এটিএম বুথ—প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ব্যাংকিং সেবা এখন মানুষের হাতের মুঠোয় ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। ব্যাংকের কর্মকর্তা বা লাইনের ওপর নির্ভর না করে নিজের স্বাধীনমতো আর্থিক লেনদেন করার ক্ষেত্রে এর অবদান অপরিসীম।
সংক্ষেপে, এটিএমের আবিষ্কার বিশ্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে আর্থিক লেনদেনকে করেছে অত্যন্ত সহজ, দ্রুত ও স্বাবলম্বী। বিজ্ঞানীদের সেই সুদীর্ঘ সাধনা ও যান্ত্রিক উৎকর্ষ মানব সভ্যতার অর্থপদ্ধতিকে এক পরম উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।