কম্পিউটার মাউস কীভাবে আবিষ্কার হলো, স্ক্রিনে কার্সার পরিচালনার মাধ্যমে কম্পিউটারের সহজ নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস
কম্পিউটার মাউস আবিষ্কারের ইতিহাস ও কম্পিউটারের সহজ নিয়ন্ত্রণ
আজকের দিনে কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখের পলকে তীরচিহ্ন বা কার্সার নড়াচড়া করতে কিংবা যেকোনো ফাইলে ক্লিক করতে হাতের স্পর্শে থাকা কম্পিউটার মাউসটি আমাদের কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি যন্ত্র। কিন্তু একসময় কম্পিউটার চালনা করা ছিল অত্যন্ত জটিল এবং কুৎসিত কমান্ড-ভিত্তিক প্রক্রিয়ার ব্যাপার, যেখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে মনিটরের সাথে ভাব বিনিময় করা ছিল প্রায় অসম্ভব। মানুষের এই যান্ত্রিক দূরত্ব ঘুচিয়ে কম্পিউটারকে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এক অবিশ্বাস্য বিপ্লব ঘটিয়েছিল কম্পিউটার মাউসের আবিষ্কার।
কম্পিউটার মাউস তৈরির এই দূরদর্শী ধারণার পেছনের মূল কারিগর ছিলেন আমেরিকান প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক ডগলাস এঙ্গেলবার্ট (Douglas Engelbart)। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (SRI) কাজ করার সময় তিনি এমন একটি উপায় খুঁজছিলেন যা দিয়ে কম্পিউটারের ডিসপ্লে স্ক্রিনে খুব দ্রুত এবং সহজে নেভিগেট করা যায়। ১৯৬৪ সালে তিনি তাঁর সহকর্মী বিল ইংলিশকে সাথে নিয়ে কাঠের তৈরি একটি ছোট বাক্স আকৃতির ডিভাইস বানান, যার নিচে ছিল দুটি লম্বালম্বি মেটাল হুইল বা চাকা। এই চাকাগুলোর ঘূর্ণন গতির মাধ্যমে স্ক্রিনের কার্সার পরিচালিত হতো এবং দেখতে ইঁদুরের মতো লম্বা লেজের মতো তার থাকায় এর নাম দেওয়া হয় 'মাউস'।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ১৯৬৮ সালে ডগলাস এঙ্গেলবার্ট তাঁর বিখ্যাত 'অল ডেমো' (The Mother of All Demos) অনুষ্ঠানে কম্পিউটারের মাউস প্রথম জনসমক্ষে সফলভাবে প্রদর্শন করেন, যা কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশনের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
- প্রাথমিক আমলের সেই কাঠের মাউসটিকে বাণিজ্যিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথ তৈরি করেছিল জেরক্স (Xerox) কোম্পানির অল্টো কম্পিউটার।
- পরবর্তীতে চাকতির বদলে বলভিত্তিক মেকানিক্যাল মাউস এবং বর্তমানের অপটিক্যাল ও লেজার মাউস প্রযুক্তির আবির্ভাব মাউসকে আরও নিখুঁত ও গতিশীল করেছে।
- গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস বা জিইউআই (GUI)-এর বিকাশে মাউস আবিষ্কারের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বড়, যা আজকের পার্সোনাল কম্পিউটার বা পিসি বিপ্লব ঘটিয়েছে।
আধুনিক যুগে মাউস প্রযুক্তির রূপান্তর ও প্রভাব
ডগলাস এঙ্গেলবার্টের সেই কাঠের ছোট্ট বাক্স ও তারযুক্ত মাউস থেকে শুরু করে আজকের ওয়্যারলেস, ব্লুটুথ এবং এর্গোনমিক অপটিক্যাল মাউস—প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কম্পিউটিং অভিজ্ঞতা আজ অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময় ও সহজ হয়েছে। দৈনন্দিন অফিসিয়াল কাজ থেকে শুরু করে গেমিং এবং গ্রাফিক ডিজাইন—সবক্ষেত্রেই মাউস এক অপরিহার্য যন্ত্র।
সংক্ষেপে, কম্পিউটার মাউসের আবিষ্কার মানুষকে কোডিংয়ের জটিল ভাষা থেকে মুক্তি দিয়ে স্ক্রিনের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের সেই সুদূরপ্রসারী চিন্তা মানব সভ্যতার ডিজিটাল প্রযুক্তিকে এক পরম উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।