পৃথিবীতে বছরে কতবার ভূমিকম্প হয় এবং বেশিরভাগ ভূমিকম্প আমরা অনুভব করি না কেন?
পৃথিবীতে বছরে কতবার ভূমিকম্প হয় এবং কেন বেশিরভাগ কম্পন অনুভূত হয় না?
আমাদের এই পৃথিবী দেখতে শান্ত মনে হলেও এর ভূ-অভ্যন্তরে টেকটনিক প্লেটের অবিরাম চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত ভূকম্পন ঘটে চলেছে—পৃথিবীতে প্রতিবছর ঠিক কতগুলো ভূমিকম্প হয়ে থাকে এবং এর মধ্যে কেন আমরা বেশিরভাগ কম্পন টের পাই না, এই প্রশ্ন মানব সভ্যতার মনে চিরকাল এক দারুণ কৌতূহল জাগিয়ে এসেছে; ভূপ্রকৃতির এই গোপন গতির রহস্য একদিনে উন্মোচিত হয়নি। মানুষের দীর্ঘদিনের সিসমোলজি, জিওলজিক্যাল সার্ভে এবং আধুনিক ভূকম্পন বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির হাত ধরেই পৃথিবীর বার্ষিক ভূমিকম্পের নিখুঁত পরিসংখ্যান বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট হয়েছিল। বর্তমান যুগে আর্থকোয়েক হ্যাজার্ড মিটিগেশন, সিসমিক নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক গবেষণা প্রযুক্তির প্রতিটি ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃতির এই অসামান্য গতিশীল রূপ মানব সভ্যতাকে আমাদের গ্রহের টেকটনিক প্লেটের মহাশক্তি এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির সাথে পরিচয় করিয়েছে। এর নেপথ্যে কাজ করেছে দীর্ঘ দশকের নিরলস সিসমোগ্রাফ (Seismograph) এবং গ্লোবাল মনিটরিং গবেষণা।
পৃথিবীতে বছরে কতবার ভূমিকম্প হয় এবং কেন তা অনুভূত হয় না তার সঠিক তথ্য মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস (USGS) এর দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন ও প্রতিবছর হওয়া ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কম্পন প্রথম নিখুঁতভাবে রেকর্ড করা সম্ভব হয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞান ও সিসমোলজিক্যাল তথ্য অনুযায়ী, এর মূল বিবরণটি হলো: বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ লক্ষ বা পাঁচ লাখের বেশি শনাক্তযোগ্য ভূমিকম্প হয়ে থাকে, যার মধ্যে লক্ষ লক্ষ অতি ক্ষুদ্র বা মাইক্রো-আর্থকোয়েক সাধারণ যন্ত্র ছাড়া ধরা পড়ে না; আর এই কম্পনগুলোর একটি বিশাল অংশ মানুষ অনুভব করতে পারে না কারণ এগুলোর তীব্রতা বা রিখটার স্কেলের মান অত্যন্ত কম থাকে এবং উৎপত্তিস্থল জনবসতি থেকে অনেক দূরে মহাসাগর বা গভীর অরণ্যে অবস্থিত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (USGS) তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় ৫ লক্ষ লক্ষণীয় ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়, যার মধ্যে মাত্র প্রায় ১ লক্ষ কম্পন মানুষ কিছুটা অনুভব করতে পারে এবং খুব সামান্য সংখ্যক কম্পন ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়。
- অধিকাংশ ভূমিকম্পের ম্যাগনিটিউড বা মাত্রা এত কম থাকে যে মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্র সেই মৃদু ঝাঁকুনি বুঝতে সক্ষম হয় না।
- ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বা হাইপোসেন্টার ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক গভীরে থাকলে ওপরের মানুষ সেই কম্পন টের পায় না।
- মহাসাগরের তলদেশে বা জনমানবহীন মেরু অঞ্চলে সংঘটিত হওয়া ছোট ও মাঝারি মাত্রার কম্পনগুলো অজানাই থেকে যায়।
সিসমোলজি ও আধুনিক ভূকম্পন গবেষণার প্রভাব
পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ কম্পন ও ভূমিকম্প নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সেই আদি সময় থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক ডিজিটাল সিসমোগ্রাফ ও আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম—প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের ভূ-তাত্ত্বিক জ্ঞানের দিগন্ত আজ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়েছে। ক্ষতিকর ভূমিকম্পের পূর্বাভাস প্রদান, শক্তিশালী ভবন নির্মাণ কৌশল উদ্ভাবন এবং লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করার ক্ষেত্রে এই গবেষণার অবদান সবচেয়ে বেশি। সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রযুক্তি বিজ্ঞানজগতে গভীর বিপ্লব ঘটিয়েছিল। প্রতিদিনের ভূগোল, ভূতত্ত্ব কিংবা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা—সবক্ষেত্রেই এর গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়।
সংক্ষেপে, পৃথিবীতে বছরে কতবার ভূমিকম্প হয় এবং বেশিরভাগ ভূমিকম্প আমরা অনুভব করি না কেন তার সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আধুনিক সিসমোলজি ও ভূগোলের নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটিয়ে আমাদের গ্রহের অভ্যন্তরীণ গতিপ্রকৃতিকে নতুনভাবে বুঝতে শিখিয়েছে। বিজ্ঞানীদের সেই সুদীর্ঘ সাধনা ও ভূকম্পন গবেষণার ইতিহাস ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আগামী দিনের বিজ্ঞান ও মানব সুরক্ষার উন্নয়নেও এই সিসমিক রিসার্চ এক প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে যাবে。