মানুষ কেন সব ধরনের শব্দ শুনতে পারে না? জানুন শ্রাব্যতার সীমা ও বৈজ্ঞানিক কারণ
মানুষ কেন সব ধরনের শব্দ শুনতে পারে না? জেনে নিন শ্রাব্যতার সীমা
প্রকৃতিতে অজস্র ধরনের শব্দ অবিরাম তৈরি হলেও আমাদের কান কেবল একটি নির্দিষ্ট সীমার ভেতরের শব্দই শুনতে পায়—মহাবিশ্বের সব কম্পন মানুষের কানে ধরা পড়ে না কেন এবং আমাদের শ্রবণ ক্ষমতার এই প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার পেছনে কাজ করা নিখুঁত বৈজ্ঞানিক কারণটি কী, এই প্রশ্ন মানব সভ্যতার মনে চিরকাল এক দারুণ কৌতূহল জাগিয়ে এসেছে; ধ্বনি বিজ্ঞান ও মানব শরীরবৃত্তের এই রহস্য একদিনে উন্মোচিত হয়নি। মানুষের দীর্ঘদিনের অ্যাকোস্টিক ফিজিক্স, বায়োলোজিক্যাল ইয়ার স্ট্রাকচার এবং আধুনিক শ্রবণ বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির হাত ধরেই মানব কানের অডিও ফ্রিকোয়েন্সি রেঞ্জের এই নিখুঁত সত্য বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট হয়েছিল। বর্তমান যুগে অটোলজি, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই কম্পাঙ্ক অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃতির এই অসামান্য রূপ মানব সভ্যতাকে আমাদের শ্রবণ ইন্দ্রিয় ও শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি লেভেলের সাথে পরিচয় করিয়েছে। এর নেপথ্যে কাজ করেছে দীর্ঘ দশকের নিরলস ফ্রিকোয়েন্সি রেসপন্স (Frequency Response) এবং কক্লিয়ার মেকানিক্স গবেষণা।
মানুষ কেন সব ধরনের শব্দ শুনতে পারে না তার সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া আবিষ্কারের ইতিহাস শুরু হয়েছিল আধুনিক পদার্থবিদ্যা এবং শারীরবৃত্তীয় গবেষণার হাত দিয়ে, যার মাধ্যমে শব্দ তরঙ্গের কম্পাঙ্ক ও মানব কানের সংবেদনশীলতা প্রথম নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভব হয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী, এর মূল প্রক্রিয়াটি হলো: মানুষের কান কেবল ২০ হার্জ (Hz) থেকে ২০,০০০ হার্জ (kHz) কম্পাঙ্কের মধ্যকার শব্দ তরঙ্গগুলোই শনাক্ত করতে পারে, যা শ্রাব্যতার সীমা (Audible Range) নামে পরিচিত; এর চেয়ে কম কম্পাঙ্কের শব্দ (ইনফ্রাসনিক বা Infrasonic) বা বেশি কম্পাঙ্কের শব্দ (আল্ট্রাসনিক বা Ultrasonic) আমাদের কানের পর্দার বা কক্লিয়ার ভেতরের সংবেদনশীল কোষগুলোকে কম্পিত করার মতো যথেষ্ট শক্তি বা উপযুক্ত গঠন না থাকায় তা মস্তিষ্কে শব্দের অনুভূতি জাগাতে পারে না।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: আধুনিক অ্যাকোস্টিক ডেটা অনুযায়ী বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ শোনার ক্ষমতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায় এবং সুস্থ তরুণ মানুষের কান ২০ হাজার হার্জ পর্যন্ত শব্দ শুনতে সক্ষম হলেও কুকুর বা বাদুড়ের মতো অনেক প্রাণী এর চেয়ে অনেক উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পারে।
- ২০ হার্জের কম কম্পাঙ্কের ইনফ্রাসনিক শব্দ যেমন ভূমিকম্প বা সমুদ্রের তরঙ্গ দ্বারা তৈরি হলেও তা মানুষের কান শুনতে পায় না।
- ২০,০০০ হার্জের বেশি কম্পাঙ্কের আল্ট্রাসনিক শব্দ যেমন বাদুড়ের নেভিগেশন বা মেডিকেল আল্ট্রাসাউন্ড আমাদের শ্রবণ সীমার বাইরে অবস্থান করে।
- কানের ভেতরে থাকা কক্লিয়া এবং বেসিলার মেমব্রেনের নির্দিষ্ট শারীরিক গঠনের কারণেই নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির বাইরে শব্দ সংকেত প্রক্রিয়া করা সম্ভব হয় না।
শব্দ বিজ্ঞান ও চিকিৎসা গবেষণার প্রভাব
মানব শ্রবণ ক্ষমতা ও শব্দ তরঙ্গ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সেই আদি সময় থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক অডিওলজি ও হিয়ারিং এইড টেকনোলজি—প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যার জ্ঞানের দিগন্ত আজ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়েছে। কানের রোগ নির্ণয়, উন্নত শ্রবণ যন্ত্র তৈরি এবং শব্দের ক্ষতিকর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে এই গবেষণার অবদান সবচেয়ে বেশি। সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রযুক্তি বিজ্ঞানজগতে গভীর বিপ্লব ঘটিয়েছিল। প্রতিদিনের পদার্থবিদ্যা, চিকিৎসা বিজ্ঞান কিংবা পরিবেশ বিজ্ঞান—সবক্ষেত্রেই এর গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়।
সংক্ষেপে, মানুষ কেন সব ধরনের শব্দ শুনতে পারে না তার সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য আবিষ্কার আধুনিক পদার্থবিদ্যা ও বায়োলোজির নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটিয়ে আমাদের শ্রবণ ইন্দ্রিয়কে নতুনভাবে বুঝতে শিখিয়েছে। বিজ্ঞানীদের সেই সুদীর্ঘ সাধনা ও শারীরবৃত্তীয় গবেষণার ইতিহাস ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আগামী দিনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নেও এই অ্যাকোস্টিক রিসার্চ এক প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে যাবে।