কসবার হোটেলে নগ্ন অবস্থায় দেহ উদ্ধার: রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য, খোঁজে পুলিশ দুই সঙ্গীর
কসবার হোটেলে রহস্যজনক মৃত্যু, নগ্ন অবস্থায় উদ্ধার যুবকের দেহ
দক্ষিণ কলকাতার কসবা অঞ্চলের একটি হোটেলে শনিবার দুপুরে মিলল এক যুবকের মৃতদেহ। ঘটনাস্থলেই দেখা যায়, মৃতের দেহ পুরোপুরি নগ্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ঘিরে ইতিমধ্যেই ছড়িয়েছে ব্যাপক রহস্য। মৃত যুবকের নাম আদর্শ লোসাল্কা (৩৩), যিনি পেশায় ছিলেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তিনি বীরভূমের দুবরাজপুরের বাসিন্দা হলেও মাঝেমধ্যে কলকাতায় থাকতেন।
হোটেলে তিন জনের প্রবেশ, কিন্তু দু’জন ফেরেননি
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ আদর্শ আরও দুই সঙ্গীকে নিয়ে হোটেলে প্রবেশ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন এক মহিলা এবং আরও এক পুরুষ। ঘর ভাড়া নেওয়ার সময় তিন জনই বৈধ পরিচয়পত্র জমা দিয়েছিলেন। এরপর তাঁরা রাতভর সেই ঘরেই ছিলেন বলে জানা যায়। তবে গভীর রাত দেড়টা বা ২টো নাগাদ ওই মহিলা এবং পুরুষ সঙ্গী হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে যান। এরপর আর তাঁরা ফিরে আসেননি।
শনিবার দুপুরে হাউসকিপিং কর্মীরা ঘরে ঢুকে দেখেন, মেঝেতে নিথর দেহ পরে আছে আদর্শের। দেহের অবস্থান দেখে প্রথমেই সন্দেহ তৈরি হয়। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দেওয়া হয় এবং কসবা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে।
প্রাথমিক তদন্তে খুনের আশঙ্কা
পুলিশ জানিয়েছে, আদর্শের নাকের নিচে রক্তের দাগ দেখা গেছে। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং খুনের সম্ভাবনাই বেশি। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত পুলিশ চূড়ান্তভাবে কিছু বলতে রাজি নয়। কলকাতা পুলিশের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) রূপেশ কুমার জানিয়েছেন, তদন্তের স্বার্থে সমস্ত তথ্য এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ ইতিমধ্যেই সংগ্রহ করেছে পুলিশ। দু’জন সঙ্গী কীভাবে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের আচরণে কোনও অস্বাভাবিকতা ছিল কি না—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁদের পরিচয়পত্র আসল কি না, তাও যাচাই চলছে।
দুই সঙ্গীর খোঁজে তৎপর পুলিশ
এই মৃত্যু যে রহস্যে ভরা তা প্রথম দেখাতেই স্পষ্ট। প্রশ্ন উঠছে—তিন জনের উদ্দেশ্য কী ছিল? তাঁরা কি সহকর্মী, নাকি বন্ধু? আদর্শের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কই বা কী? কেন তাঁরা মাঝরাতে হঠাৎ হোটেল থেকে বেরিয়ে গেলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, যে মহিলা এবং পুরুষ আদর্শের সঙ্গে এসেছিলেন, তাঁদের মোবাইল নম্বর, ঠিকানা এবং জমা দেওয়া পরিচয়পত্রের সত্যতা এখন যাচাই করা হচ্ছে। যদি পরিচয়পত্র ভুয়ো হয়, তবে এই তদন্ত আরও জটিল হয়ে পড়বে।
পুলিশ আদর্শের পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। তাঁর বীরভূমের বাড়িতেও খবর পাঠানো হয়েছে। আদর্শ কেন কলকাতায় এসেছিলেন এবং হোটেলে উঠেছিলেন, তা নিয়েও খোঁজখবর শুরু হয়েছে।
মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনে নজর সিসিটিভি ফুটেজে
হোটেলের প্রতিটি করিডোর এবং প্রবেশদ্বারে থাকা ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ওই ফুটেজেই লুকিয়ে থাকতে পারে ঘটনার আসল সূত্র। বিশেষত রাত দেড়টা বা ২টো নাগাদ দুই সঙ্গীর বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য, তাঁদের মুখভঙ্গি, আচরণ—সব কিছুই বিচার্য।
এছাড়া ঘরের ভেতরের অবস্থা, কোনও জোরপূর্বক কিছু ঘটেছিল কি না, বিছানা বা মেঝেতে রক্তের দাগ বা ধস্তাধস্তির চিহ্ন আছে কি না—এসবও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফরেনসিক টিমও ঘরটি পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে।
হঠাৎ মৃত্যু না কি পরিকল্পিত খুন?
পুলিশের একাংশের অনুমান, কোনও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জট, আর্থিক বিবাদ বা ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেও এই মৃত্যু ঘটতে পারে। আবার এটি একটি দুর্ঘটনাও হতে পারে—তবে মৃতের নগ্ন দেহ এবং রক্তের দাগ এই সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পরই স্পষ্ট হবে আদর্শের মৃত্যুর আসল কারণ। তবে ইতিমধ্যেই এই ঘটনা কসবা এবং তার আশপাশে যথেষ্ট আলোড়ন ফেলেছে।