কৃত্রিম হৃদপিণ্ড কীভাবে তৈরি হলো, মানব হৃদয়ের বিকল্প খোঁজার অসাধারণ বৈজ্ঞানিক ইতিহাস
কৃত্রিম হৃদপিণ্ড আবিষ্কারের ইতিহাস ও মানুষের হৃদয়ের বিকল্প খোঁজ
মানব শরীরের সবচেয়ে ব্যস্ত ও প্রাণবন্ত অঙ্গ হলো হৃদপিণ্ড, যা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একটানা রক্ত পাম্প করে শরীরকে সচল রাখে। কিন্তু কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিওর বা হৃদপিণ্ডের চরম অকার্যকারিতার ক্ষেত্রে যখন কোনো ওষুধ বা সাধারণ চিকিৎসা আর কাজ করে না, তখন রোগীর বেঁচে থাকার একমাত্র আশা হয়ে দাঁড়ায় প্রতিস্থাপন। কিন্তু দাতা হৃদপিণ্ডের তীব্র সংকট ও দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে বহু রোগীর মৃত্যু অনিবার্য হয়ে পড়ত। মানুষের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক অবিশ্বাস্য বিপ্লব ঘটিয়েছিল সম্পূর্ণ কৃত্রিম হৃদপিণ্ড বা আর্টিফিশিয়াল হার্টের আবিষ্কার।
কৃত্রিম হৃদপিণ্ড তৈরির এই কঠিন ও দীর্ঘ যাত্রার পেছনে রয়েছে বহু প্রকৌশলী ও চিকিৎসকের অক্লান্ত পরিশ্রম। ১৯৫০-এর দশক থেকে কৃত্রিম অঙ্গ নিয়ে কাজ শুরু হলেও এর বাস্তব রূপ দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন ডাচ বংশোদ্ভূত মার্কিন চিকিৎসক উইলেম কোলফ এবং তরুণ গবেষক রবার্ট জারভিক (Robert Jarvik)। তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে পলিউরেথেন ও অ্যালুমিনিয়াম উপাদান ব্যবহার করে এমন একটি পাম্প তৈরির চেষ্টা করেন যা মানুষের আসল হৃদপিণ্ডের মতো নিখুঁতভাবে রক্ত সঞ্চালন করতে পারবে। অবশেষে ১৯৮১ সালে তাঁরা সফলভাবে তৈরি করেন 'জারভিক-সেভেন' (Jarvik-7) নামক প্রথম সফল কৃত্রিম হৃদপিণ্ড।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ১৯৮২ সালের ২ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ মেডিকেল সেন্টারে ড. উইলিয়াম ডিভ্রিজ সার্জন হিসেবে এবং রবার্ট জারভিক প্রকৌশলী হিসেবে প্রথম সফলভাবে মানুষের শরীরে 'জারভিক-সেভেন' কৃত্রিম হৃদপিণ্ড স্থায়ীভাবে প্রতিস্থাপন করেন।
- বার্নি ক্লার্ক নামক একজন মুমূর্ষু দন্তচিকিৎসকের শরীরে প্রথম এই কৃত্রিম হৃদপিণ্ড সফলভাবে বসানো হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
- প্রাথমিক আমলের কৃত্রিম হৃদপিণ্ডগুলো বড় আকারের এক্সটার্নাল বা বাইরের কনসোলের সাথে ক্যাবলের মাধ্যমে যুক্ত থাকত, যা রোগীর চলাফেরা সীমিত করত।
- আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখন আরও হালকা, টেকসই এবং সম্পূর্ণ শরীরের ভেতরে ফিট হতে সক্ষম বায়ো-কম্প্যাটিবল কৃত্রিম হৃদপিণ্ড তৈরি করা হচ্ছে।
আধুনিক যুগে কৃত্রিম হৃদপিণ্ডের রূপান্তর ও ভবিষ্যৎ
রবার্ট জারভিকের সেই আদি জারভিক-সেভেন পাম্প থেকে শুরু করে আজকের অত্যন্ত উন্নত এবং টেকসই লেভিয়েট ও ম্যাগলেভ (Maglev) প্রযুক্তির ভেন্ট্রিকুলার অ্যাসিস্ট ডিভাইস (VAD)—চিকিৎসা ক্ষেত্রে কার্ডিয়াক সাপোর্টের মান বহুগুণ বেড়েছে। দাতা হৃদপিণ্ডের অপেক্ষায় থাকা রোগীদের জীবন বাঁচাতে এই প্রযুক্তি আজ ঈশ্বরের আশীর্বাদ হয়ে কাজ করছে।
সংক্ষেপে, কৃত্রিম হৃদপিণ্ডের আবিষ্কার মানব শরীরের সবচেয়ে বড় জৈবিক সীমাবদ্ধতাকে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জয় করার এক অনন্য ইতিহাস। বিজ্ঞানীদের সেই সুদীর্ঘ সাধনা ও সাহসিকতা মানব সভ্যতার চিকিৎসাবিজ্ঞানকে এক পরম উৎকর্ষে পৌঁছে দিয়েছে, যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।