ফ্যাক্স মেশিন কীভাবে আবিষ্কার হলো, দূরদূরান্তে মুহূর্তে নথি ও ছবি পাঠানোর পুরনো সেই বৈপ্লবিক ইতিহাস
ফ্যাক্স মেশিন আবিষ্কারের ইতিহাস ও দূরদূরান্তে নথি পাঠানোর সূচনা
আজকের দিনে ইমেল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি ক্লিকেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গুরুত্বপূর্ণ নথি বা ছবি পাঠিয়ে দেওয়া পানির মতো সহজ। কিন্তু ইন্টারনেট বা ডিজিটাল স্ক্যানারের সেই যুগ আসার আগে যখন সুদূর প্রবাসে বা অন্য শহরে কোনো লিখিত কাগজ বা ছবি তাৎক্ষণিকভাবে পাঠাতে হতো, তখন ভরসা ছিল কেবল ডাক বিভাগ এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষা। মানুষের এই যোগাযোগ দূরত্ব ঘুচিয়ে টেলিফোনের তারের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে যেকোনো লিখিত নথি বা ছবি কাগজের হুবহু প্রতিলিপিসহ পৌঁছে দেওয়ার অবিশ্বাস্য বিপ্লব ঘটিয়েছিল ফ্যাক্স মেশিন (Fax Machine)-এর আবিষ্কার।
ফ্যাক্স বা ফেকসিমিলি (Facsimile) প্রযুক্তির আদি ধারণাটি টেলিফোন আবিষ্কারের এমনকি বেশ আগেই দানা বেঁধেছিল। ১৮৪৩ সালে স্কটিশ উদ্ভাবক আলেকজান্ডার বেইন (Alexander Bain) প্রথম ইলেকট্রিক প্রিন্টিং টেলিগ্রাফ আবিষ্কার করেন, যা ঘড়ির পিন্ডুলাম ও বৈদ্যুতিক সংকেত ব্যবহার করে কাগজের ওপর রেখা বা চিহ্ন পাঠাতে সক্ষম ছিল। এরপর ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী জিওভানি কাসেলি 'পান্তেলিগ্রাফ' (Pantelegraph) নামক যন্ত্রের সাহায্যে তারের মাধ্যমে ছবি ও হস্তাক্ষর পাঠানোর সফল বাণিজ্যিক প্রয়োগ ঘটান। পরবর্তীতে এটি জেরক্স ও কর্পোরেট অফিসের কল্যাণে আধুনিক ফ্যাক্স মেশিনে রূপান্তরিত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ১৮৪৩ সালে আলেকজান্ডার বেইনের প্রথম ফেকসিমিলি সিস্টেমের পেটেন্ট এবং পরবর্তী সময়ে বিংশ শতাব্দীতে জিরক্স কর্তৃক প্রথম আধুনিক ব্যবসায়িক ফ্যাক্স মেশিন বাজারে আসার ফলে দূরদূরান্তে যোগাযোগের গতি চিরতরে বদলে যায়।
- প্রাথমিক আমলের ফ্যাক্স মেশিনগুলো দিয়ে ছবি বা লেখা পাঠাতে বেশ দীর্ঘ সময় লাগত এবং কাগজের মানও খুব একটা ভালো ছিল না।
- ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে টেপ ও থার্মাল পেপার প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ফ্যাক্স মেশিন বিশ্বের প্রতিটি অফিস ও ব্যবসার অপরিহার্য যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
- যদিও বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইমেল ও ক্লাউড স্টোরেজের কারণে গতানুগতিক ফ্যাক্স মেশিনের ব্যবহার কমেছে, তবুও আইনি ও চিকিৎসাক্ষেত্রে নিরাপদ নথি স্থানান্তরে এর ডিজিটাল রূপ এখনও ব্যবহৃত হয়।
আধুনিক যুগে ফ্যাক্স প্রযুক্তির রূপান্তর ও ঐতিহ্য
আলেকজান্ডার বেইনের সেই আদি পিন্ডুলাম ও তারের যন্ত্র থেকে শুরু করে আজকের অনলাইন ইন্টারনেট ফ্যাক্স (e-Fax) সেবা—প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দাপ্তরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক বেশি আধুনিক ও নিরাপদ হয়েছে। পুরোনো দিনের সেই ঘড়ির কাটার শব্দযুক্ত ফ্যাক্স মেশিনগুলো আজ আমাদের স্মৃতির পাতায় এক অনন্য ইতিহাস হয়ে রয়েছে।
সংক্ষেপে, ফ্যাক্স মেশিনের আবিষ্কার ভৌগোলিক দূরত্বকে জয় করে কাগজের লেখাকে মুহূর্তের মধ্যে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। বিজ্ঞানীদের সেই সুদীর্ঘ সাধনা ও যান্ত্রিক উৎকর্ষ মানব সভ্যতার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এক পরম উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।