পারমাণবিক শক্তি কীভাবে আবিষ্কারের পথে এল, পরমাণুর অদৃশ্য নিউক্লিয়াস ভেঙে শক্তির অপার ভাণ্ডার উন্মোচনের ইতিহাস

পারমাণবিক শক্তি কীভাবে আবিষ্কারের পথে এল, পরমাণুর অদৃশ্য নিউক্লিয়াস ভেঙে শক্তির অপার ভাণ্ডার উন্মোচনের ইতিহাস

পারমাণবিক শক্তি আবিষ্কারের ইতিহাস ও পরমাণু বিভাজনের সূচনা

প্রকৃতির সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম কণা পরমাণুর ভেতর যে শক্তির এক অবিশ্বাস্য ও ধ্বংসাত্মক ভাণ্ডার লুকিয়ে আছে, তা একসময় মানুষের ধারণারও বাইরে ছিল। দৃশ্যমান কয়েন বা তেল পুড়িয়ে শক্তি পাওয়ার প্রচলিত ধারণাকে পেছনে ফেলে পদার্থের মূল ভিত্তি বা নিউক্লিয়াসকে ভেঙে মহাজাগতিক শক্তির উৎস উন্মোচন করার বৈজ্ঞানিক বিপ্লব হলো পারমাণবিক শক্তি (Nuclear Energy)। মানব সভ্যতার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প বিপ্লবের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া এই রহস্যময় শক্তির আবিষ্কার একদিনে বা কোনো একক মানুষের প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিনের পরমাণু গবেষণা, তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার এবং বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের ভেতর দিয়ে আধুনিক পারমাণবিক ফিশন প্রযুক্তির জন্ম হয়েছিল।

পারমাণবিক শক্তির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল উনবিংশ শতকের শেষভাগে হেনরি বেকেরেল কর্তৃক তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার এবং পরবর্তীতে মেরি ও পিয়ের কুউরির গবেষণার মাধ্যমে। তবে পরমাণুর ভেতর থেকে শক্তি বের করে আনার মূল রহস্যটি প্রথম উদ্ঘাটিত হয় ১৯৩৮ সালে জার্মান রসায়নবিদ অটো হান (Otto Hahn) এবং ফ্রিৎস স্ট্রাসম্যান (Fritz Strassmann)-এর হাতে, যখন তাঁরা ইউরেনিয়াম পরমাণুকে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করে দুটি ছোট অংশে বিভক্ত করতে সক্ষম হন। তাঁদের এই পরীক্ষামূলক ফিশন বা বিভাজনের সঠিক তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং হিসাব দেন বিজ্ঞানী লিজ মাইটনার (Lise Meitner) ও অটো ফ্রেশ। তাঁরা প্রমাণ করেন যে ভারী পরমাণু ভাঙার সময় সামান্য ভর নিখোঁজ হয়ে আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ শক্তি বা তাপ মুক্ত হয়।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ১৯৩৮ সালে অটো হান ও ফ্রিৎস স্ট্রাসম্যান নিউক্লিয়ার ফিশন বা পারমাণবিক বিভাজন আবিষ্কার করেন এবং ১৯৪২ সালে এনরিকো ফার্মির নেতৃত্বে শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম ও নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

  • প্রাথমিক পর্যায়ে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার মূলত সামরিক অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীতে ১৯৫০-এর দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রথম পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করা হয়।
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং পরিষ্কার শক্তি পাওয়ার এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়।
  • আধুনিক যুগে এসে থার্মোনিউক্লিয়ার ফিউশন গবেষণা, থোরিয়াম রিঅ্যাক্টর এবং উন্নত নিউক্লিয়ার সেফটি মেকানিজমের ছোঁয়ায় পারমাণবিক শক্তি অনেক বেশি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করার কাজ চলছে।

আধুনিক যুগে পারমাণবিক শক্তির রূপান্তর ও প্রভাব

অটো হানের সেই ল্যাবরেটরির ইউরেনিয়াম ফিশন পরীক্ষা থেকে শুরু করে আজকের অতি সুরক্ষিত পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও মহাকাশ গবেষণার রেডিওআইসোটোপ জেনারেটর—প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের শক্তির চাহিদা মেটানোর পদ্ধতি অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কার্বন নির্গমন কমানোর বৈশ্বিক লড়াইয়ে এবং বিপুল পরিমাণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে এই শক্তির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংক্ষেপে, পারমাণবিক শক্তির আবিষ্কার খালি চোখে অদৃশ্য পরমাণুর ভেতর লুকিয়ে থাকা অপার শক্তির ভাণ্ডারকে মানুষের করায়ত্ত করেছে। বিজ্ঞানীদের সেই সুদীর্ঘ সাধনা ও কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের উৎকর্ষ মানব সভ্যতার শক্তি উৎপাদনকে এক পরম উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।