আল্ট্রাসাউন্ড কীভাবে আবিষ্কার হলো, চিকিৎসাবিজ্ঞানে শব্দ তরঙ্গের অসাধারণ ব্যবহার
আল্ট্রাসাউন্ড আবিষ্কারের ইতিহাস ও চিকিৎসায় শব্দ তরঙ্গের ব্যবহার
চোখে না দেখেও শব্দের প্রতিধ্বনি বা ইকো (Echo) ব্যবহার করে শরীরের অভ্যন্তরীন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বা গর্ভস্থ ভ্রূণের নিখুঁত ছবি দেখার যে প্রযুক্তি আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানে অলৌকিক সাফল্য এনে দিয়েছে, তা হলো আল্ট্রাসাউন্ড বা সনোগ্রাফি। ক্ষতিকারক এক্স-রে বিকিরণ ছাড়াই মানুষের শরীরের নরম টিস্যু ও অঙ্গের চিত্র তুলে ধরার এই অভিনব পদ্ধতি একদিনে তৈরি হয়নি। সামুদ্রিক প্রযুক্তির হাত ধরে শুরু হওয়া শব্দ তরঙ্গের এই অসাধারণ ব্যবহার চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তির মূল ভিত্তি লুকিয়ে আছে পিজোলেকট্রিক ইফেক্ট (Piezoelectric effect)-এর ওপর, যা ১৮৮০ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী পিয়ের কুরি এবং জ্যাক কুরি আবিষ্কার করেছিলেন। এই নীতি অনুসারে নির্দিষ্ট কিছু স্ফটিকের ওপর চাপ প্রয়োগ করলে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় এবং উল্টোটা করলে তারা শব্দ তরঙ্গ তৈরি করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সাবমেরিন শনাক্তকরণের জন্য সোনার (SONAR) প্রযুক্তি হিসেবে এর প্রথম বড় ব্যবহার শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চিকিৎসকরা এই শব্দ তরঙ্গকে মানব শরীরের রোগ নির্ণয়ের কাজে লাগানোর চিন্তা করেন।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ১৯৫০-এর দশকে স্কটিশ চিকিৎসক ইয়ান ডোনাল্ড (Ian Donald) এবং তাঁর সহযোগীরা প্রথম আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহার করে গর্ভাবস্থার সমস্যা ও পেটের ভেতরের টিউমার নিখুঁতভাবে শনাক্ত করেন।
- ইয়ান ডোনাল্ড গাইনোকোলজি ও অবস্টেট্রিক্সে আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহার জনপ্রিয় করে তোলেন, যা মা ও অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিপ্লব ঘটায়।
- আল্ট্রাসাউন্ডে কোনো ধরনের আয়োনাইজিং রেডিয়েশন বা ক্ষতিকারক রশ্মি থাকে না বলে এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ।
- হৃদপিণ্ডের ভালਵ পরীক্ষা (Echocardiogram) এবং রক্তনালীর অবস্থা যাচাইয়েও আল্ট্রাসাউন্ড আজ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
আধুনিক যুগে আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তির রূপান্তর
প্রাথমিক আমলের সেই সাদা-কালো ঝাপসা ছবি তোলার মেশিন থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক থ্রি-ডি (3D) এবং ফোর-ডি (4D) রিয়েল-টাইম আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানার—প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গর্ভস্থ শিশুর নড়াচড়া এখন স্পষ্ট দেখা সম্ভব হচ্ছে। পোর্টেবল বা হ্যান্ডহেল্ড আল্ট্রাসাউন্ড ডিভাইস আসার ফলে জরুরি চিকিৎসায় এটি আরও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।
সংক্ষেপে, আল্ট্রাসাউন্ডের আবিষ্কার অদৃশ্য শব্দকে রূপ দিয়েছে জীবন্ত ছবিতে। বিজ্ঞানীদের সেই সুদীর্ঘ সাধনা ও প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ মানব সভ্যতার চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক সুরক্ষাকবচ তৈরি করেছে, যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।