পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশ ভ্যাটিকান সিটি যেভাবে তৈরি হলো এবং সেখানে কত মানুষ বাস করে

পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশ ভ্যাটিকান সিটি যেভাবে তৈরি হলো এবং সেখানে কত মানুষ বাস করে

পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটির জন্ম ইতিহাস ও ভৌগোলিক বসতি

ইতালির রোম শহরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত হলেও সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশটির নাম হলো 'ভ্যাটিকান সিটি' (Vatican City). মাত্র ০.৪৪ বর্গকিলোমিটার বা প্রায় ১১০ একর আয়তনের এই ক্ষুদ্র দেশটির আত্মপ্রকাশ কেবল কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তন নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে শত শত বছরের খ্রিস্টীয় পাপাচার, রাজনৈতিক কূটনীতি এবং ঐতিহাসিক চুক্তির এক দীর্ঘ ইতিহাস। মানুষের দীর্ঘদিনের সার্বভৌম ধর্মীয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সাধনা এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির হাত ধরেই এই অনন্য দেশটির জন্ম হয়েছিল। বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বিশ্ব ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং পর্যটনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভ্যাটিকান সিটির গুরুত্ব অপরিসীম। রোমের পেটের ভেতরে থেকেও সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্তা বজায় রাখা এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি মানব সভ্যতাকে রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়ের সাথে পরিচয় করিয়েছে। এর নেপথ্যে কাজ করেছে দীর্ঘ কয়েক দশকের নিরলস লাটেরান চুক্তি (Lateran Treaty) এবং কূটনৈতিক আলোচনা।

ভ্যাটিকান সিটি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯ শতকের মধ্যভাগে ইতালীয় একত্রীকরণের সময় যখন পোপদের ঐতিহাসিক পন্টিফিক্যাল স্টেট বা পাপাল স্টেটস ইতালির দখলে চলে যায়, আর ১৯২৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইতালীয় সরকার ও পোপ একাদশ পিয়াসের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক 'লাটেরান চুক্তি' (Lateran Treaty)-র মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্যাটিকান সিটির জন্ম হয়। আধুনিক জনগণনা অনুযায়ী, ভ্যাটিকান সিটির স্থায়ী জনসংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যেখানে সাধারণত ৮০০ থেকে ৯০০ জন মানুষ বসবাস করেন; এই জনসংখ্যার মধ্যে রয়েছেন খোদ পোপ, বিভিন্ন দেশের পোপের কূটনৈতিক প্রতিনিধি বা নানসিও, কার্ডিনাল এবং পবিত্র সাধু সিটের সেবায় নিয়োজিত বিশ্বের ক্ষুদ্রতম ও প্রাচীনতম পেশাদার সামরিক বাহিনী 'সুইস গার্ড' (Swiss Guard), যাদের নাগরিকত্ব কেবল তাদের চাকরির মেয়াদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ১৯২৯ সালে ইতালির সাথে স্বাক্ষরিত লাটেরান চুক্তির (Lateran Treaty) মাধ্যমে পোপের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভ্যাটিকান সিটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল।

  • প্রাথমিক আমলের রোমান সাম্রাজ্য ও মধ্যযুগে পোপের ক্ষমতা পুরো ইতালি ও ইউরোপের একটা বড় অংশে বিস্তৃত ছিল, যার কোনো নির্দিষ্ট আধুনিক জাতীয় সীমানা ছিল না।
  • ১৯ শতকের শেষের দিকে ইতালীয় সেনাবাহিনী রোম দখল করার পর প্রায় ষাট বছর ধরে পোপ ও ইতালীয় সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈরিতা বজায় ছিল।
  • আধুনিক যুগে এসে ভ্যাটিকান সিটি নিজস্ব মুদ্রা (ইউরো), নিজস্ব ডাকটিকিট, নিজস্ব রেডিও স্টেশন এবং জাতিসংঘের অবসার্ভার স্টেট হিসেবে বিশ্বমঞ্চে এক স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মর্যাদা লাভ করেছে।

আধুনিক যুগে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ও কূটনীতি গবেষণার রূপান্তর ও প্রভাব

ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সেই অস্থির ঐতিহাসিক দিনগুলো থেকে শুরু করে আজকের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটি—প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির দিগন্ত আজ সম্পূর্ণ নতুন রূপ পেয়েছে। বিশ্বের কোটি কোটি ক্যাথলিক খ্রিস্টানের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র রক্ষা করা এবং বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় কূটনৈতিক ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে এই দেশটির অবদান সবচেয়ে বেশি। সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে বিশ্বমানের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞান মানব সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছে। প্রতিদিনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ইতিহাস চর্চা কিংবা বিশ্ব রাজনীতি—সবক্ষেত্রেই এর গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়।

সংক্ষেপে, পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশ ভ্যাটিকান সিটির সৃষ্টি এবং এর সুনির্দিষ্ট জনসংখ্যা ব্যবস্থা আধুনিক কূটনীতি ও ইতিহাসের নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটিয়ে আমাদের রাজনৈতিক পৃথিবীকে নতুনভাবে বুঝতে শিখিয়েছে। বিজ্ঞানীদের ও ইতিহাসবিদদের সেই সুদীর্ঘ সাধনা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আগামী দিনের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নয়নেও এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এক প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে যাবে।