পশ্চিমবঙ্গে ‘অপারেশন সাইবার প্রহার’, সাত দিনে ১০৭ গ্রেফতার, ভাঙল ৯২.৬ কোটি টাকার সাইবার প্রতারণার চক্র
সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে বড় অভিযান
সংগঠিত সাইবার প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সাইবার ক্রাইম শাখা বড়সড় অভিযান চালাল। ‘অপারেশন সাইবার প্রহার’ নামে রাজ্যজুড়ে চলা এই অভিযানে প্রথম সাত দিনে ৬৯টি এফআইআর দায়ের এবং ১০৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের হিসাবে, অভিযানের আওতায় আসা প্রতারণামূলক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৯২.৬৬৪ কোটি টাকা।
রাজ্যের সাইবার ক্রাইম উইং এবং S4C-এর নেতৃত্বে এই অভিযান চালানো হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সাইবার অপরাধের হটস্পট এবং প্রতারণা চক্রকে সহায়তা করে এমন পরিকাঠামো চিহ্নিত করে একযোগে অভিযান চালানো হয়। শুধু সরাসরি প্রতারণায় যুক্ত সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার নয়, এই অভিযানে সাইবার অপরাধের পিছনে থাকা আর্থিক ও প্রযুক্তিগত নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
১০৭ জন গ্রেফতার, ৬৯টি মামলা
অভিযানের প্রথম সপ্তাহে মোট ১০৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ জনকে সরাসরি পশ্চিমবঙ্গ সাইবার ক্রাইম উইং গ্রেফতার করেছে। প্রশাসনিকভাবে এই গ্রেফতারগুলি বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের আওতায় নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় অন্যান্য পুলিশ ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান চালানো হয়।
এই অভিযানে কলকাতা পুলিশ-সহ বিভিন্ন পুলিশ এলাকার একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়েছে। তদন্তকারীরা এমন সব কেন্দ্রকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন, যেখান থেকে প্রতারণামূলক ফোন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আর্থিক লেনদেন পরিচালিত হচ্ছিল। অভিযানের অংশ হিসেবে তিনটি বেআইনি কল সেন্টার-এও অভিযান চালানো হয়েছে।
শুধু প্রতারক নয়, নজরে গোটা নেটওয়ার্ক
‘অপারেশন সাইবার প্রহার’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সাইবার প্রতারণার সহায়ক পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা। তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে এমন একাধিক আর্থিক ও প্রযুক্তিগত মাধ্যম, যেগুলি প্রতারণার টাকা সরানো, নগদে রূপান্তর বা অপরাধীদের যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যবহৃত হতে পারে।
- প্রথম সাত দিনে ১০৭ জন গ্রেফতার হয়েছে।
- ৬৯টি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।
- প্রতারণামূলক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৯২.৬৬৪ কোটি টাকা বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
- সাইবার ক্রাইম উইং সরাসরি ৪০ জনকে গ্রেফতার করেছে।
- তিনটি বেআইনি কল সেন্টারে অভিযান চালানো হয়েছে।
- মিউল ও বেনিফিশিয়ারি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সন্দেহজনক এটিএম ও নগদ তোলার জায়গা এবং সিম বা POS ব্যবস্থার দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে।
৪০০-র বেশি সিম নিষ্ক্রিয়
তদন্তের সময় সাইবার প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, অভিযানের সময়ে ৪০০-র বেশি সিম কার্ড নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। পাশাপাশি সন্দেহজনক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, এটিএম ও নগদ উত্তোলনের স্থান, ব্যাংক শাখা এবং বেআইনি POS বা সিম ইস্যু করার জায়গাগুলিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
সাইবার প্রতারণা চক্রগুলি অনেক সময় একাধিক ব্যক্তি ও পরিকাঠামোর মাধ্যমে কাজ করে। ফলে কোনও একটি জায়গায় অভিযান চালিয়ে পুরো নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা কঠিন। সেই কারণেই ‘অপারেশন সাইবার প্রহার’-এ প্রতারণার অর্থনৈতিক পথ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সহায়ক পরিকাঠামোর উপর একসঙ্গে নজর দেওয়া হয়েছে।
অভিযান এখনও চলবে
পশ্চিমবঙ্গ সাইবার ক্রাইম উইং জানিয়েছে, ‘অপারেশন সাইবার প্রহার’ এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং রাজ্যজুড়ে এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। সংগঠিত সাইবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্কগুলিকে চিহ্নিত করে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করাই অভিযানের মূল লক্ষ্য।
প্রথম সাত দিনে ১০৭ জনের গ্রেফতার, ৬৯টি মামলা এবং প্রায় ৯২.৬৬৪ কোটি টাকার প্রতারণামূলক লেনদেন চিহ্নিত হওয়ার ঘটনায় রাজ্যে সংগঠিত সাইবার অপরাধের পরিসরও স্পষ্ট হচ্ছে। পুলিশের এই সমন্বিত অভিযান আগামী দিনে আরও কতগুলি প্রতারণা চক্র ও তাদের সহায়ক পরিকাঠামোকে আইনের আওতায় আনে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।