মানুষ ঘুমের মধ্যে হঠাৎ চমকে ওঠে কেন? জানুন এর পেছনের কারণ ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

মানুষ ঘুমের মধ্যে হঠাৎ চমকে ওঠে কেন? জানুন এর পেছনের কারণ ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

মানুষ ঘুমের মধ্যে হঠাৎ চমকে ওঠে কেন? জেনে নিন বৈজ্ঞানিক কারণ

রাতে বিছানায় ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে বা ঘুমের প্রথম পর্যায়ে হঠাৎ করেই পুরো শরীর বা হাত-পা জোরালোভাবে কেঁপে ওঠে এবং অনেক সময় মানুষ আতঙ্কিত হয়ে জেগে ওঠে—ঘুমের ভেতরে এই ধরনের আকস্মিক চমকে ওঠার নেপথ্যে কাজ করে এক সুনির্দিষ্ট জৈবিক ও স্নায়বিক প্রক্রিয়া। সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে যে, শান্তিতে ঘুমানোর সময় হঠাৎ কেন এমন শারীরিক ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। মূলত আমাদের মস্তিষ্কের মোটর কন্ট্রোল এবং স্নায়ুতন্ত্রের পারস্পরিক শিথিলকরণ প্রক্রিয়ার ফলেই এই ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও নিউরোসায়েন্সের গবেষণায় এই বিষয়ের ওপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে যা ঘুমের ভেতরের এই অদ্ভুত স্নায়বিক অবস্থাকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে।

বিজ্ঞানীদের মতে, যখন আমরা জেগে থাকা অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে গভীর ঘুমের দিকে যেতে শুরু করি, তখন আমাদের হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ কমতে থাকে এবং মস্তিষ্ক সারা দিনের ক্লান্তি দূর করার জন্য পেশিগুলোকে সম্পূর্ণ শিথিল বা অবশ করার সংকেত পাঠায়। এই ট্রানজিশন বা পরিবর্তনের সময় মস্তিষ্কের অবচেতন অংশ কোনো কারণে পেশির শিথিল হওয়াকে হঠাৎ পড়ে যাওয়ার বা ভারসাম্য হারানোর ভুল সঙ্কেত হিসেবে ধরে নেয়, যার ফলে মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিকভাবে পেশিগুলোতে একটি প্রতিরক্ষামূলক বৈদ্যুতিক শক বা সংকোচন পাঠায় এবং শরীর একঝলকে চমকে ওঠে। এ ছাড়া অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ, মানসিক উদ্বেগ বা দিনের চরম ক্লান্তি এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ঘুমের মধ্যে হঠাৎ এই চমকে ওঠার ঘটনাটিকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় 'হাইপনিক জের্ক' বা স্লিপ স্টার্ট বলা হয়, যা প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।

  • স্লিপ সাইকেলে প্রবেশ করার সময় মস্তিষ্কের পেশি শিথিল করার সিগন্যালে সামান্য বিভ্রান্তি ঘটলে এই আকস্মিক ঝাঁকুনি বা চমক লাগে।
  • অতিরিক্ত চা-কফি বা এনার্জি ড্রিংকস পান করার ফলে স্নায়ুতন্ত্র অতিরিক্ত উদ্দীপিত থাকায় ঘুমের শুরুতে শরীর কেঁপে উঠতে পারে।
  • ক্লান্তি, মানসিক চাপ বা অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাসের কারণেও মস্তিষ্কের ট্রানজিশন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়ে হাইপনিক জের্কের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

স্নায়বিক প্রক্রিয়া ও এর প্রভাব

ঘুমের মধ্যে হঠাৎ চমকে ওঠার এই প্রবণতা সাধারণত কোনো বড় রোগের লক্ষণ নয় এবং এটি সম্পূর্ণ ক্ষতিকর একটি বিষয় নয়। তবে যদি এই চমকানোর মাত্রা অতিরিক্ত হয় এবং এর কারণে রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়, তবে তা ঘুমের গুণগত মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য সঠিক স্লিপ হাইজিন মেনে চলা এবং নিয়মিত সময়ে ঘুমাতে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। ক্যাফেইন ও মানসিক চাপ এড়িয়ে চললে এই ধরনের শারীরিক ঝাঁকুনি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

পরিশেষে, ঘুমের মধ্যে হঠাৎ চমকে ওঠার বিষয়টি মূলত মানবদেহের জটিল স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। এই বিষয়ে সঠিক বৈজ্ঞানিক ধারণা থাকলে অপ্রয়োজনীয় ভীতি দূর করা সহজ হয় এবং স্বাস্থ্যকর ঘুমের পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।