ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতার হোটেলগুলিতে নিরাপত্তা পরিদর্শন শুরু, বন্ধ ৫০০টির বেশি গেস্ট হাউস
ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতার হোটেলগুলিতে শুরু জোরদার নিরাপত্তা পরিদর্শন
খাস কলকাতার বুকে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের (বর্তমান নাম মির্জা গালিব স্ট্রিট) একটি হোটেলে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের পর অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য প্রশাসন ও কলকাতা পৌরসংস্থা (KMC)। গত আগস্ট মাসে 'শিখা ইন' নামের ওই হোটেলের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দমবন্ধ হয়ে এক শিশু-সহ ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়, যাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, ওই পাঁচতলা ভবনটিতে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে একাধিক হোটেল চলছিল এবং সেখানে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে বেরোনোর কোনো ইমার্জেন্সি এক্সিট বা আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। দমকলের সদর দপ্তরের ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে এমন একটি ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরেই শহরের অন্যান্য হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলির পরিকাঠামো এবং ফায়ার সেফটি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন ওঠে। এই চরম গাফিলতির পুনরাবৃত্তি রুখতেই এবার কলকাতা জুড়ে শুরু হয়েছে প্রশাসনিক স্তরে ব্যাপক নিরাপত্তা অডিট এবং পরিদর্শন।
কলকাতা পৌরসংস্থার বিল্ডিং বিভাগ এবং রাজ্য দমকল দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে শহরের প্রায় ৪,০০০ রেস্তোরাঁ, হোটেল ও গেস্ট হাউসের বিস্তারিত তালিকা তৈরি করে এই ম্যারাথন নিরাপত্তা পরিদর্শন শুরু হয়েছে। মূলত ধর্মতলা, নিউ মার্কেট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, কলিন লেন, পার্ক স্ট্রিট, পার্ক সার্কাস, বাইপাস সংলগ্ন মুকুন্দপুর এবং বড়বাজার এলাকার হোটেলগুলির ওপর সবচেয়ে বেশি কড়া নজর রাখা হচ্ছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, যেসব হোটেলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, স্মোক ডিটেক্টর (Smoke Detector), ফায়ার অ্যালার্ম এবং বিল্ডিং প্ল্যানের বৈধ নথিপত্র নেই, সেগুলিকে কোনো সুযোগ না দিয়ে অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই গুরুতর আইন অমান্য করার অভিযোগে শহরের ৫০০-র বেশি হোটেল ও গেস্ট হাউসকে 'ক্লোজার নোটিশ' (Closure Notice) ধরিয়েছে পৌরসংস্থা।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শহরের নির্দিষ্ট জোনগুলিতে এই ফায়ার সেফটি অডিট বা নিরাপত্তা পরিদর্শন শেষ করার কড়া ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছে কলকাতা কর্পোরেশন। নিরাপত্তার ন্যূনতম মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এই নোটিশ পাওয়া হোটেলগুলিকে নতুন করে ব্যবসা শুরু করার কোনো অনুমতি দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
- তদন্তের আওতা: কলকাতা কর্পোরেশনের অন্তর্গত ১৬টি বরোর অধীনস্থ প্রায় ৪,০০০ ছোট-বড় হোটেল ও গেস্ট হাউস
- প্রশাসনিক পদক্ষেপ: আইনভঙ্গের দায়ে ইতিমধ্যেই ৫০০টির বেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে সাময়িক বন্ধের নোটিশ (Closure Notice) প্রদান
- পরিদর্শনের মূল ফোকাস: পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট (Fire Safety Certificate), জলের ট্যাঙ্ক এবং ইমার্জেন্সি এক্সিট যাচাই
- নির্ধারিত ডেডলাইন ও টার্গেট: আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের সেফটি অডিট ও পরিদর্শন শেষ করার কঠিন লক্ষ্যমাত্রা
দুর্গাপুজোর আগে কড়াকড়ি এবং হোটেল ব্যবসায়ীদের শঙ্কা
সামনেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো এবং পর্যটনের অন্যতম বড় মরশুম। ঠিক এই সময়ে প্রশাসনের এমন কড়া পদক্ষেপে রীতিমতো শোরগোল ও আতঙ্ক পড়ে গেছে শহরের ছোট ও মাঝারি হোটেল মালিকদের মধ্যে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, নিউ মার্কেট, মির্জা গালিব স্ট্রিট ও মারকুইস স্ট্রিট সংলগ্ন এলাকায় বহু হোটেল মালিক হঠাৎ পরিদর্শনের মুখে পড়ার ভয়ে এবং শাস্তিমূলক পদক্ষেপ এড়াতে স্বেচ্ছায় বুকিং নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। পুজোর মুখে আচমকা ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং বহু সাধারণ কর্মীর কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা দেখা দেওয়ায় হোটেল মালিক সংগঠনের একাংশ পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে লাইসেন্স পুনর্বিবেচনা ও কিছুটা সময় দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন।
তবে কলকাতা কর্পোরেশন ও দমকল দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, মানুষের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনোভাবেই ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। নাগরিক সুরক্ষা সবার আগে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপ অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী। শহরের কেন্দ্রস্থলে ঘিঞ্জি এলাকার মধ্যে গজিয়ে ওঠা এই বেআইনি ও ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্যিক কারবারগুলোতে নিয়মিত প্রশাসনিক নজরদারি চালানো হলে আগামী দিনে এই ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে।
প্রশাসনিক নজরদারির এই পদক্ষেপে সাধারণ মানুষ ও পর্যটকরা অনেকটাই স্বস্তিতে রয়েছেন। কারণ, উৎসবের দিনগুলোতে বহু বিদেশি এবং ভিন রাজ্যের পর্যটক কলকাতায় এসে এই ধরনের হোটেলে ওঠেন। তাঁদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাজ্য সরকারের অন্যতম বড় দায়িত্ব। তাই সাময়িক ব্যবসায়িক ক্ষতির কথা বিবেচনা না করে, দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার স্বার্থে এই অভিযানকে সমর্থন জানাচ্ছেন কলকাতাবাসী।