মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে ভয়াবহ আগুনে ৯ জনের মৃত্যু, তদন্তে SIT গঠন কলকাতা পুলিশের
মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, প্রাণ গেল ৯ জনের
কলকাতার নিউ মার্কেট থানা এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটে একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক এবং এক শিশু রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে আগুন লাগার কারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না এবং হোটেল কর্তৃপক্ষ নিয়ম মেনেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT গঠন করেছে কলকাতা পুলিশ।
১৯ আগস্ট, ২০২৬ গভীর রাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের পাঁচতলা ভবন ‘ফ্লরেন্স ম্যানশন’-এর দ্বিতীয় তলে অবস্থিত ‘শিখা ইন’ হোটেলে আগুন লাগে। রাত প্রায় ২টা নাগাদ আগুনের খবর পেয়ে দমকল ও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি ভবনের ভিতরে আটকে থাকা মানুষজনকে বের করে আনার চেষ্টা চালানো হয়। দমকলের তৎপরতায় প্রায় ৬০ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ধোঁয়ার কারণে একাধিক ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু, হাসপাতালে চিকিৎসা
প্রাথমিকভাবে সামনে এসেছে, আগুনের পাশাপাশি ঘন ধোঁয়া দ্রুত ভবনের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ধোঁয়ার মধ্যে আটকে পড়া কয়েকজনের শ্বাসকষ্ট ও শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে মোট ৯ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকদের উপস্থিতির কারণে ঘটনাটি আন্তর্জাতিক স্তরেও গুরুত্ব পেয়েছে।
উদ্ধার অভিযান: আগুন লাগার পর দমকল বাহিনী ভবনের ভিতরে আটকে থাকা বাসিন্দা ও হোটেলের অতিথিদের নিরাপদে বের করে আনার জন্য অভিযান চালায়। প্রায় ৬০ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার পরও দীর্ঘ সময় ধরে ভবনের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করা হয়, যাতে ভিতরে আর কেউ আটকে না থাকেন।
তদন্তে কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল
মৃত্যুর সংখ্যা এবং ঘটনার ভয়াবহতার কথা মাথায় রেখে কলকাতা পুলিশ একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে। ACP পদমর্যাদার অফিসার ভাগীরথ ঘোষের নেতৃত্বে তদন্ত চলছে। আগুন কীভাবে লাগল, কোনও বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা অন্য কোনও কারণ ছিল কি না এবং অগ্নিনির্বাপণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না, তদন্তে সেই সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা হোটেল পরিচালনা, ভবনের ব্যবহার, জরুরি পরিস্থিতিতে বেরিয়ে আসার ব্যবস্থা এবং অগ্নি নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদনের বিষয়গুলিও পরীক্ষা করছেন। ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নথিপত্র সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। ফরেন্সিক ও অগ্নি বিশেষজ্ঞদের মতামতও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
হোটেলের লিজগ্রহীতা গ্রেপ্তার, মালিকের খোঁজে পুলিশ
এই ঘটনায় হোটেলের লিজগ্রহীতা আবু জাফরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁকে জোড়াসাঁকো এলাকা থেকে আটক করার পর গ্রেপ্তার করা হয় বলে তদন্ত সূত্রে খবর। অন্যদিকে ভবনের বা হোটেল সংক্রান্ত মূল মালিকানা ও দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত বীরেশ্বর মিত্রের খোঁজ চলছে। তদন্তের স্বার্থে তাঁর ভূমিকা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব সংক্রান্ত বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ধৃত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা BNS এবং পশ্চিমবঙ্গ ফায়ার সার্ভিস আইনের প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। তদন্তে অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু ঘটানো, গাফিলতি এবং অগ্নি নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে কার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হবে, তা তদন্ত ও আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করবে।
- ১৯ আগস্ট গভীর রাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে আগুন লাগে।
- ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
- নিহতদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক এবং এক শিশু রয়েছে।
- দমকলের উদ্ধার অভিযানে প্রায় ৬০ জনকে নিরাপদে বের করে আনা হয়।
- ঘটনার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT গঠন করেছে কলকাতা পুলিশ।
- হোটেলের লিজগ্রহীতা আবু জাফরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর কলকাতার হোটেল ও অন্যান্য বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পুরনো ভবনে পরিচালিত হোটেলগুলিতে জরুরি নির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, তা নিয়েও তদন্ত ও প্রশাসনিক নজরদারি বাড়তে পারে।
SIT-এর তদন্তে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এবং কোনও ব্যক্তি বা সংস্থার গাফিলতি ছিল কি না, তা স্পষ্ট হওয়ার পরই ঘটনার পূর্ণ চিত্র সামনে আসবে। তদন্তের পাশাপাশি নিহতদের পরিচয় ও ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও চলছে। কলকাতার এই ভয়াবহ হোটেল অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কত দ্রুত এগোয় এবং দায় নির্ধারণে কী তথ্য সামনে আসে, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।