পরিবেশ দূষণ ও আইন: জনস্বার্থে আইন অমান্যকারীদের শাস্তির বিধান সম্পর্কে জানুন
পরিবেশ দূষণ ও আইনি কাঠামোর পটভূমি
প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা এবং সুস্থ পরিবেশে বেঁচে থাকা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবন ধারণের অধিকারের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পাওয়ার সুযোগকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, জলাশয় ভরাট এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এই দূষণ রোধে এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় ভারতে 'পরিবেশ সুরক্ষ আইন, ১৯৮৬' (Environment Protection Act, 1986)-সহ একাধিক কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
আইন অমান্য করে বায়ুমণ্ডল, জলাশয় বা মাটি দূষিত করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ও আর্থিক জরিমানের ব্যবস্থা রয়েছে। পরিবেশের ক্ষতি করাকে এখন আর সাধারণ অবহেলা নয়, বরং জনস্বার্থবিরোধী গুরু অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
পরিবেশ রক্ষায় ভারতের প্রধান প্রধান আইনসমূহ:
- পরিবেশ সুরক্ষা আইন, ১৯৮৬: পরিবেশের ক্ষতি রোধে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা প্রদানকারী মূল আইন।
- জল (দূষণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৭৪: নদী, নালা ও জলাশয়ে শিল্পজাত বা বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
- বায়ু (দূষণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৮১: কলকারখানা ও যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর গ্যাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট আইনি মানদণ্ড।
- শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা) বিধি, ২০০০: উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান বা প্রচারে নির্ধারিত ডেসিবল মাত্রার বেশি শব্দ তৈরি বা মাইক বাজানো নিষিদ্ধ।
- জাতীয় সবুজ ট্রাইব্যুনাল (NGT) আইন, ২০১০: পরিবেশ সংক্রান্ত বিরোধ ও মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গঠিত বিশেষ আদালত।
আইন অমান্যকারীদের শাস্তির কড়া বিধান
পরিবেশ আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় প্রকার আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। পরিবেশ সুরক্ষা আইনের অধীনে নির্ধারিত নিয়ম না মানলে বা দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের নির্দেশ অমান্য করলে প্রথম অপরাধের জন্য ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
যদি আইন অমান্য করার ঘটনা ক্রমাগত চলতে থাকে, তবে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানের নির্দেশ দেওয়া যায়। কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য নিঃসরণ করলে তার বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আইনি ক্ষমতা রয়েছে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের (State Pollution Control Board)।
জনস্বার্থে নাগরিকদের আইনি অধিকার ও প্রতিকার পাওয়ার উপায়
আপনার এলাকায় কোনো কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি যদি অবৈধভাবে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ কিংবা জলাশয় দূষিত করে, তবে সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনি আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। প্রথম ধাপে স্থানীয় পুরসভা, পঞ্চায়েত বা রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা সম্ভব।
তাছাড়া, পরিবেশের বড় ধরনের ক্ষতির বিরুদ্ধে যেকোনো নাগরিক বা সংস্থা উচ্চ আদালত কিংবা জাতীয় সবুজ ট্রাইব্যুনালে (National Green Tribunal - NGT) জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করতে পারেন। পরিবেশ রক্ষা করা সরকারের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক দায়িত্ব, আর এই সংক্রান্ত সচেতনতা বাড়লেই একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।