জনপ্রতিনিধির জবাবদিহিতা: বিধায়ক বা কাউন্সিলরের কাজের খতিয়ান কীভাবে চাইবেন?
জনপ্রতিনিধির কাজের হিসাব কীভাবে জানবেন?
আপনার এলাকার বিধায়ক বা কাউন্সিলর কী কাজ করেছেন, কোন প্রকল্পে কত টাকা খরচ হয়েছে, কোনও উন্নয়নমূলক কাজের অনুমোদন হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে তথ্য জানতে নাগরিক হিসেবে সরকারি নথি ও তথ্য জানার অধিকার ব্যবহার করা যায়। তবে প্রতিনিধির ব্যক্তিগত মতামত বা রাজনৈতিক বক্তব্যের বদলে তাঁর দফতর বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কাছে থাকা নথিভুক্ত তথ্য চাওয়া বেশি কার্যকর।
বিধায়কের কাজ সম্পর্কে কীভাবে তথ্য পাবেন?
বিধায়ক রাজ্য বিধানসভার সদস্য। তাঁর বিধানসভা এলাকার উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রকল্প, সরকারি অর্থ বরাদ্দ বা কোনও নির্দিষ্ট কাজের প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পর্কে তথ্য সাধারণত সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে থাকতে পারে। কোন তথ্য কোন দফতরের কাছে রয়েছে, তা আগে চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
নির্দিষ্ট কোনও প্রকল্পের অনুমোদন, বরাদ্দের পরিমাণ, কাজের আদেশ, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, খরচ এবং কাজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নথি থাকলে সেই তথ্য চাওয়া যেতে পারে। শুধু “বিধায়ক কী কী কাজ করেছেন?”-এর মতো বিস্তৃত প্রশ্নের বদলে নির্দিষ্ট প্রকল্প বা নথির তথ্য চাওয়া হলে উত্তর পাওয়া সহজ হতে পারে।
কাউন্সিলরের কাজের খতিয়ান কোথায় পাওয়া যাবে?
কাউন্সিলর সাধারণত পুরসভা বা পুরনিগমের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। রাস্তা, নিকাশি, স্ট্রিট লাইট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা স্থানীয় নাগরিক পরিষেবার মতো বিষয় সংশ্লিষ্ট পুরসভা বা পুরনিগমের অধীনে থাকতে পারে। তাই কোনও কাউন্সিলরের এলাকার কাজের তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট পুরসভা বা পুরনিগমের দফতরে অভিযোগ বা তথ্যের আবেদন করা যেতে পারে।
অনেক পুরসভা নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকল্প, টেন্ডার, বাজেট বা নাগরিক পরিষেবা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে। প্রথমে সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য দেখে নেওয়া ভালো। প্রয়োজনীয় তথ্য সেখানে না থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী RTI-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট নথি চাওয়া যেতে পারে।
RTI দিয়ে কী কী তথ্য চাইতে পারেন?
Right to Information Act, 2005 নাগরিকদের সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্য পাওয়ার আইনি অধিকার দেয়। তবে RTI-এর মাধ্যমে কোনও সরকারি দফতরকে নতুন করে বিশ্লেষণ, মতামত বা ব্যাখ্যা তৈরি করতে বাধ্য করা যায় না। তাই “কেন জনপ্রতিনিধি কাজ করেননি?”-এর বদলে সংশ্লিষ্ট নথি ও রেকর্ড চাওয়া বেশি উপযুক্ত।
- কোনও প্রকল্পের অনুমোদনের কপি চাইতে পারেন।
- প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ জানতে পারেন।
- কাজের অনুমোদন বা Work Order-এর কপি চাইতে পারেন।
- কোন সংস্থা বা ঠিকাদার কাজটি পেয়েছে, সেই নথিভুক্ত তথ্য চাইতে পারেন।
- প্রকল্পে কত টাকা খরচ হয়েছে তার সরকারি রেকর্ড চাইতে পারেন।
- কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, তার Completion Certificate বা সংশ্লিষ্ট নথি থাকলে চাইতে পারেন।
- কাজের পরিদর্শন বা Measurement Book-সহ প্রাসঙ্গিক রেকর্ডের তথ্য চাইতে পারেন, যদি তা সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে থাকে।
RTI করার সময় কীভাবে প্রশ্ন করবেন?
RTI আবেদনে প্রশ্ন যতটা সম্ভব নির্দিষ্ট হওয়া উচিত। উদাহরণ হিসেবে, “আমাদের এলাকায় রাস্তা তৈরির জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে এবং সেই প্রকল্পের Work Order-এর একটি কপি চাই”—এই ধরনের নথিভিত্তিক প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। একটি আবেদনে একই দফতরের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি নির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া যেতে পারে।
কোন সরকারি দফতরের কাছে তথ্য রয়েছে তা নিশ্চিত না হলে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বিভাগের Public Information Officer বা PIO সম্পর্কে তথ্য দেখে নেওয়া ভালো। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রে RTI Online পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে। রাজ্য সরকারি কর্তৃপক্ষের জন্য প্রযোজ্য পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী হতে পারে।
তথ্য না পেলে কী করবেন?
RTI আবেদনের জবাব না পাওয়া, অসম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া বা তথ্য প্রত্যাখ্যান করা হলে আইনে নির্ধারিত পদ্ধতিতে First Appeal করার সুযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী আপিল বা অভিযোগের ব্যবস্থাও থাকতে পারে। তাই মূল RTI আবেদন, জমা দেওয়ার প্রমাণ এবং পাওয়া উত্তর নিরাপদে রেখে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
জনপ্রতিনিধির কাজ যাচাই করতে আর কী করবেন?
শুধু RTI-এর উপর নির্ভর না করে সরকারি বাজেট, টেন্ডার, প্রকল্পের তালিকা, পুরসভার সভার নথি বা সংশ্লিষ্ট দফতরের প্রকাশিত তথ্যও দেখা যেতে পারে। কোনও উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবে হয়েছে কি না জানতে সরকারি নথির সঙ্গে এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখা কার্যকর পদ্ধতি। তবে কোনও কাজ হয়নি বলে অভিযোগ করার আগে প্রকল্পের অনুমোদন, সময়সীমা বা বাস্তবায়নের দায়িত্ব কোন সংস্থার তা যাচাই করা উচিত।
তথ্য চাইতে গিয়ে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
- প্রথমে সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশিত আছে কি না দেখুন।
- কোন দফতরের কাছে তথ্য রয়েছে তা চিহ্নিত করুন।
- RTI-তে নির্দিষ্ট নথি, রেকর্ড ও তথ্যের বিবরণ চান।
- অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়ার বদলে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় সরকারি রেকর্ডের উপর গুরুত্ব দিন।
- আবেদন ও উত্তরের কপি সংরক্ষণ করুন।
- প্রয়োজনে First Appeal-এর আইনি ব্যবস্থা ব্যবহার করুন।
জবাবদিহিতা মানে তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন
জনপ্রতিনিধির কাজের খতিয়ান জানতে নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে অভিযোগ বা সমালোচনার আগে সরকারি নথি, প্রকল্পের তথ্য ও বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি। বিধায়ক বা কাউন্সিলরের ব্যক্তিগতভাবে কী কাজ করেছেন তার বদলে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের কাছে থাকা প্রকল্প, বরাদ্দ, খরচ ও বাস্তবায়নের নথি চাওয়া হলে জবাবদিহিতার বিষয়টি আরও তথ্যভিত্তিক হয়। নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশিত না থাকলে RTI-এর মাধ্যমে প্রযোজ্য সরকারি রেকর্ড চাওয়া যেতে পারে।