এনআরএস হাসপাতালে নার্সের মৃত্যু: ফেন্টানিলের ভায়াল উদ্ধার, আত্মহত্যা নাকি অন্য কারণ খতিয়ে দেখছে পুলিশ
এনআরএস হাসপাতালে কর্মরত নার্সের রহস্যমৃত্যু
কলকাতার নীলরতন সরকার (NRS) মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নাইট ডিউটির সময় এক কর্মরত নার্সের মৃত্যু ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে। ১২ আগস্ট রাতে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে কর্মরত ৩০ বছর বয়সি রুপালি বর্মনকে হাসপাতালের একটি শৌচাগারের ভিতর অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাটি নিয়ে ইতিমধ্যেই পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য দফতরের অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, রুপালি ওই রাতে প্রায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে শৌচাগারে যান। দীর্ঘ সময় তিনি ডিউটিতে ফিরে না আসায় সহকর্মীদের সন্দেহ হয়। পরে ভিতর থেকে বন্ধ থাকা দরজা খুলে তাঁকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁকে দ্রুত জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে এখনও পর্যন্ত কোনও দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি এবং কোনও সুইসাইড নোটও মেলেনি।
শৌচাগার থেকে ফেন্টানিলের ভায়াল ও সিরিঞ্জ
ঘটনার তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে শৌচাগারের ভিতর থেকে উদ্ধার হওয়া কিছু সামগ্রী। পুলিশ জানিয়েছে, সেখানে অ্যানাস্থেশিয়া ও চিকিৎসায় ব্যবহৃত শক্তিশালী ওষুধ ফেন্টানিলের তিনটি খালি ভায়াল এবং একটি সিরিঞ্জ পাওয়া গিয়েছে। এই তথ্য সামনে আসার পর অতিরিক্ত মাত্রায় ওই ওষুধ শরীরে প্রবেশ করেছিল কি না, তা নিয়ে তদন্তকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে ফেন্টানিলের কারণে অতিরিক্ত মাত্রায় মৃত্যু হয়েছে—এমন কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। চিকিৎসক বা তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমানকে মৃত্যুর নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শরদ্বত মুখোপাধ্যায়ও জানিয়েছেন, অনুমানের ভিত্তিতে নয়, ময়নাতদন্ত এবং বৈজ্ঞানিক তদন্তের ফলের ভিত্তিতেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে।
আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনও কারণ?
রুপালি বর্মণের মৃত্যু আত্মহত্যা, দুর্ঘটনাজনিত ওষুধের অতিরিক্ত প্রয়োগ, নাকি অন্য কোনও কারণে হয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। ঘটনাস্থলে কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে পুলিশ আপাতত এমন কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি, যা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে এটি আত্মহত্যা বা অপরাধমূলক ঘটনা। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
তাঁর ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবনে কোনও ধরনের চাপ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হতে পারে। পুলিশ তাঁর মোবাইল ফোন ও যোগাযোগের তথ্য পরীক্ষা করছে বলে জানা গিয়েছে। ডিউটির সময় তাঁর সঙ্গে থাকা সহকর্মী, নার্স এবং চিকিৎসকদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই তথ্যগুলি থেকে মৃত্যুর আগে তাঁর গতিবিধি এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিসিটিভি ও সহকর্মীদের বয়ান খতিয়ে দেখা হচ্ছে
এন্টালি থানার পুলিশ হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। ফুটেজে রুপালিকে একাই শৌচাগারের দিকে যেতে দেখা গিয়েছে বলে তদন্তের সঙ্গে যুক্ত সূত্রে জানা গিয়েছে। শৌচাগারে প্রবেশের পর কী ঘটেছিল, তা জানতে ওই সময়ের আশপাশের সমস্ত ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
- ঘটনার সময় রুপালি বর্মণ নাইট ডিউটিতে ছিলেন।
- শৌচাগার থেকে তিনটি খালি ফেন্টানিল ভায়াল ও একটি সিরিঞ্জ উদ্ধার হয়েছে।
- দেহে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
- ঘটনাস্থলে কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি।
- পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোন এবং সহকর্মীদের বয়ান পরীক্ষা করছে।
ময়নাতদন্ত এনআরএসের বাইরে
ঘটনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে রুপালির পরিবারের পক্ষ থেকে এনআরএস মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্ত না করার অনুরোধ জানানো হয়। পরিবারের অনুরোধ মেনে মৃতদেহ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধানের তত্ত্বাবধানে ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষার ফল মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। বিশেষ করে শরীরে কোনও ওষুধ বা মাদকের মাত্রা, কীভাবে তা শরীরে প্রবেশ করেছিল এবং মৃত্যুর সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না—এসব বিষয় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
সাত কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্টের নির্দেশ
ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষ থেকেও অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত কমিটিতে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধানের পাশাপাশি হাসপাতালের প্রিন্সিপাল, মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট-কাম-ভাইস প্রিন্সিপাল, নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট এবং মনোরোগ বিভাগের প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের রাখার কথা জানানো হয়েছে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।
ফলে আপাতত রুপালি বর্মণের মৃত্যু নিয়ে একাধিক সম্ভাবনা তদন্তের আওতায় রয়েছে। ফেন্টানিলের ভায়াল উদ্ধার হওয়া নিঃসন্দেহে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, কিন্তু সেটিকেই মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ধরা হয়নি। ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলের তথ্য এবং সহকর্মীদের বয়ান—এই সবকটি দিকের ফলাফল সামনে আসার পরই ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব হবে।
```