কলকাতা মেট্রোর পার্পল লাইনে বড় সাফল্য, খিদিরপুর-ভিক্টোরিয়া অংশে দ্বিতীয় সুড়ঙ্গের কাজ সম্পূর্ণ

কলকাতা মেট্রোর পার্পল লাইনে বড় সাফল্য, খিদিরপুর-ভিক্টোরিয়া অংশে দ্বিতীয় সুড়ঙ্গের কাজ সম্পূর্ণ

খিদিরপুর-ভিক্টোরিয়া অংশে দ্বিতীয় সুড়ঙ্গের কাজ শেষ

কলকাতা মেট্রোর জোকা-এসপ্ল্যানেড করিডোরের পার্পল লাইনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। খিদিরপুর থেকে ভিক্টোরিয়া স্টেশন পর্যন্ত দ্বিতীয় ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। ১১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জায়ান্ট টানেল বোরিং মেশিন বা TBM ‘দিব্যা’ ভিক্টোরিয়া স্টেশনের নির্ধারিত অংশে পৌঁছে টানেল ব্রেকথ্রু সম্পন্ন করে। এর ফলে খিদিরপুর-ভিক্টোরিয়া অংশে প্রয়োজনীয় দুটি যমজ সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ শেষ হলো।

এর আগে ১০ জুলাই অপর TBM ‘দুর্গা’ প্রথম সুড়ঙ্গের খনন সম্পূর্ণ করেছিল। ফলে একই অংশে পরপর দুটি টানেল নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো প্রকল্পের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, কারণ এই ভূগর্ভস্থ অংশটি কলকাতার ব্যস্ত ও ঐতিহাসিক এলাকার নিচ দিয়ে নির্মিত হচ্ছে।

১.৭২ কিলোমিটার সুড়ঙ্গ খনন করেছে ‘দিব্যা’

সেন্ট থমাস স্কুল চত্বরে তৈরি লঞ্চিং শ্যাফ্ট থেকে কাজ শুরু করে TBM ‘দিব্যা’ প্রায় ১.৭২ কিলোমিটার পথ মাটির নিচ দিয়ে খনন করেছে। এই মেশিনের মাধ্যমে খননকাজ শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর। প্রায় ১০ মাসের কাজের পর মেশিনটি ভিক্টোরিয়া স্টেশনে পৌঁছেছে।

চেন্নাইয়ে তৈরি এই আর্থ প্রেসার ব্যালেন্সিং প্রযুক্তির TBM-এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৫ মিটার এবং ওজন প্রায় ৬০০ টন। কলকাতার নরম মাটি ও তুলনামূলক বেশি ভূগর্ভস্থ জলস্তরের মতো পরিস্থিতি সামলানোর জন্য মেশিনটিতে বিশেষ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে।

  • ‘দিব্যা’ প্রায় ১.৭২ কিলোমিটার সুড়ঙ্গ খনন করেছে।
  • খননকাজ শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর।
  • TBM-এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৫ মিটার।
  • মেশিনটির ওজন প্রায় ৬০০ টন।
  • খিদিরপুর-ভিক্টোরিয়া অংশের দুইটি সুড়ঙ্গের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও ফোর্ট উইলিয়ামের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ

এই প্রকল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শহরের ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছ দিয়ে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ তৈরি করা। টানেলটি ফোর্ট উইলিয়াম এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মতো সংবেদনশীল এলাকার নিচ দিয়ে নির্মিত হয়েছে। মাটির উপর স্বাভাবিক যান চলাচল বজায় রেখেই এই কাজ সম্পন্ন করার জন্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্মাণ প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়েছে।

প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে এই অংশের কাজ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ সুড়ঙ্গ তৈরির সময় ভূগর্ভস্থ মাটির চাপ, জলস্তর এবং উপরিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোর নিরাপত্তা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়েছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, কাজের সময় উপরিভাগে কোনও বড় ধরনের কাঠামোগত ক্ষতি হয়নি।

এরপর কোথায় যাবে TBM?

খিদিরপুর-ভিক্টোরিয়া অংশের টানেলিং শেষ হওয়ার পর TBM ‘দুর্গা’ এবং ‘দিব্যা’কে ধাপে ধাপে খুলে বের করার কাজ হবে। এরপর ভিক্টোরিয়া থেকে পার্ক স্ট্রিটের দিকে প্রায় ৯০০ মিটার অংশের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ তৈরির জন্য মেশিনগুলিকে পুনরায় ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। পার্ক স্ট্রিট অংশ অতিক্রম করার পর প্রকল্পের বাকি অংশে কাট-অ্যান্ড-কভার পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে জোকা থেকে মাঝেরহাট পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার এলিভেটেড অংশে মেট্রো পরিষেবা চালু রয়েছে। জোকা-এসপ্ল্যানেড করিডোরের বাকি অংশ সম্পূর্ণ হলে দক্ষিণ কলকাতা ও শহরতলির সঙ্গে কেন্দ্রীয় কলকাতার যোগাযোগ আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যাত্রীদের জন্য কী সুবিধা হবে?

জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো করিডোর সম্পূর্ণ চালু হলে জোকা, ঠাকুরপুকুর, বেহালা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের শহরের কেন্দ্রীয় অংশে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নতুন একটি দ্রুত পরিবহণ ব্যবস্থা তৈরি হবে। বর্তমানে যেসব যাত্রীকে সড়কপথের যানজটের উপর নির্ভর করতে হয়, তাঁদের জন্য মেট্রো পরিষেবা বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে পার্ক স্ট্রিট ও এসপ্ল্যানেডে অন্যান্য মেট্রো লাইনের সঙ্গে যাত্রীদের রুট পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে পার্পল লাইনের সঙ্গে কলকাতার উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম মেট্রো নেটওয়ার্কের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে।

২০২৯ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ রুট চালুর লক্ষ্য

রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড বা RVNL-এর পক্ষ থেকে জোকা-এসপ্ল্যানেড করিডোর সম্পূর্ণ করার জন্য ২০২৯ সালের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। খিদিরপুর-ভিক্টোরিয়া অংশের যমজ সুড়ঙ্গের কাজ শেষ হওয়ায় প্রকল্পটি সেই লক্ষ্যের দিকে আরও এক ধাপ এগোল। এখন পরবর্তী সুড়ঙ্গ নির্মাণ, স্টেশন সংক্রান্ত কাজ এবং বাকি পরিকাঠামো তৈরির দিকে নজর থাকবে।

সব মিলিয়ে, TBM ‘দিব্যা’-র টানেল ব্রেকথ্রু কলকাতার মেট্রো সম্প্রসারণে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বিশেষ করে ঐতিহাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার নিচ দিয়ে নিরাপদে যমজ সুড়ঙ্গ নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ায় জোকা-এসপ্ল্যানেড করিডোরের বাকি অংশ সম্পূর্ণ করার পথ আরও পরিষ্কার হয়েছে।

```