কলকাতার স্কুল হস্টেলে ৬ ছাত্রীর শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ, ৩৩ জন অসুস্থের পর ৭ দিনের জন্য হস্টেল বন্ধ

কলকাতার স্কুল হস্টেলে ৬ ছাত্রীর শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ, ৩৩ জন অসুস্থের পর ৭ দিনের জন্য হস্টেল বন্ধ

কলকাতার স্কুল হস্টেলে ছাত্রীদের অসুস্থতা

উত্তর কলকাতার পার্ক ইনস্টিটিউশন ফর গার্লস স্কুলের হস্টেলে একসঙ্গে বহু ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় স্বাস্থ্য দফতর সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করেছে। ১০ আগস্ট থেকে হস্টেলের আবাসিক ছাত্রীদের একাংশের মধ্যে জ্বর, পেট ব্যথা, বমি, মাথা ঘোরা এবং শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে অসুস্থ ছাত্রীদের আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগে ভর্তি করা হয়। সোম ও মঙ্গলবার মিলিয়ে মোট ৩৩ জন ছাত্রীকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

পরীক্ষার জন্য পাঠানো নমুনার মধ্যে ছয় জন ছাত্রীর শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। তবে স্বাস্থ্য দফতরের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুধুমাত্র ইনফ্লুয়েঞ্জা এ সংক্রমণকেই সব ছাত্রীর অসুস্থতার একমাত্র কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে না। হস্টেলের খাবার অথবা পানীয় জলে কোনও ধরনের দূষণ ঘটেছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কীভাবে শুরু হয়েছিল অসুস্থতা?

হস্টেলে থাকা ছাত্রীদের মধ্যে আচমকা একাধিক শারীরিক উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। কয়েকজনের জ্বর ও মাথা ঘোরা থাকলেও অনেকের পেটের সমস্যা, বমিভাব এবং শ্বাসকষ্টের অভিযোগ ছিল। অসুস্থতার ধরন একাধিক হওয়ার কারণে চিকিৎসকেরা সংক্রমণ এবং খাদ্য বা জলবাহিত অসুস্থতা—দুই সম্ভাবনাই বিবেচনায় রেখেছেন।

আক্রান্ত ছাত্রীদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসা শুরু করা হয়। পরবর্তীতে নমুনা পরীক্ষায় ছয় জনের ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ শনাক্ত হয়। তবে এর সঙ্গে হস্টেলের অন্যান্য ছাত্রীর অসুস্থতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা করা হচ্ছে।

খাবার ও পানীয় জলের নমুনা পরীক্ষা

ঘটনার পর স্বাস্থ্য দফতরের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হস্টেলের পরিবেশ এবং খাবার-পানীয় জলের নিরাপত্তা খতিয়ে দেখেন। আইসিএমআর-এর অধীন কলকাতার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ ইন ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনসের একটি দল হস্টেলে গিয়ে জল, খাবার এবং দুধের নমুনা সংগ্রহ করেছে। এই নমুনাগুলির পরীক্ষার রিপোর্ট থেকেই খাবার বা জলের মাধ্যমে কোনও জীবাণু ছড়িয়েছিল কি না, সে বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

চূড়ান্ত ল্যাবরেটরি রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত অসুস্থতার নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিতভাবে বলা হচ্ছে না। তাই ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ধরা পড়লেও সেটিকে পুরো ঘটনার একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। একইসঙ্গে সংক্রমণ প্রতিরোধে হস্টেলের পরিচ্ছন্নতা ও জল সরবরাহ ব্যবস্থার উপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।

হস্টেল বন্ধ, চলছে পরিষ্কার ও জীবাণুনাশের কাজ

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে স্কুলের হস্টেলটি সাময়িকভাবে খালি করে সাত দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হস্টেল পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত করা এবং সম্ভাব্য সংক্রমণের উৎস চিহ্নিত করার কাজ চালানো হচ্ছে। কলকাতা পুরসভা ও স্কুল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে জল সংরক্ষণের ব্যবস্থাও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

  • হস্টেলের ওভারহেড জলাধার পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়েছে।
  • ভূগর্ভস্থ রিজার্ভারও পরিষ্কার করা হচ্ছে।
  • জল, খাবার ও দুধের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
  • সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রুখতে হস্টেল সাত দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।
  • স্বাস্থ্য দফতর পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে।

বর্তমানে কেমন আছেন অসুস্থ ছাত্রীরা?

আর জি কর হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, চিকিৎসাধীন ৩৩ জন ছাত্রীর মধ্যে ২৬ জনের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় তাঁদের বুধবার হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি সাত জন ছাত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থাও স্থিতিশীল বলে জানা গিয়েছে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে তাঁদের রাখা হয়েছে।

পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকরা হাসপাতাল এবং স্কুল হস্টেল পরিদর্শন করেছেন। স্বাস্থ্য দফতরের জনস্বাস্থ্য শাখার প্রতিনিধিরাও বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। নবনিযুক্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী শরদ্বত মুখোপাধ্যায় হাসপাতালে গিয়ে অসুস্থ ছাত্রীদের চিকিৎসার বিষয়ে খোঁজ নেন।

আতঙ্কের কারণ নেই, তবে নজরদারি জারি

বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে স্বাস্থ্য দফতর ও হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা এ শনাক্ত হলেও এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। তবে অসুস্থতার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ। সেই রিপোর্ট হাতে না আসা পর্যন্ত খাবার, জল এবং সংক্রমণ—সব সম্ভাবনাই নজরে রাখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, হস্টেল সাময়িক বন্ধ রেখে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং জলাধার সাফাইয়ের কাজ চালানো হচ্ছে। আক্রান্ত ছাত্রীদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নতুন করে কেউ অসুস্থ হচ্ছেন কি না, তার উপরও নজর রাখা হচ্ছে। ফলে আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও স্বাস্থ্য দফতর সতর্কতামূলক নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।

```