NRS হাসপাতালে নার্স রূপালি বর্মণের মৃত্যু, আত্মহত্যা নাকি অন্য কিছু? তদন্তে একাধিক প্রশ্ন
NRS হাসপাতালে নার্সের রহস্যমৃত্যু
কলকাতার নীলরতন সরকার (NRS) মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে কর্মরত স্টাফ নার্স রূপালি বর্মণের মৃত্যু ঘিরে তদন্ত আরও জটিল হয়ে উঠেছে। হাসপাতালের শৌচাগারের ভিতর থেকে ডিউটিরত অবস্থায় তাঁর দেহ উদ্ধার করা হয়। মাত্র এক বছর আগে বিয়ে হওয়া রূপালির এমন মৃত্যু আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনও ঘটনার ফল—তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। পুলিশ ঘটনাটির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে।
প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটিকে আত্মহত্যার সম্ভাবনার দিক থেকে দেখা হলেও, পরিবারের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা অন্য সম্ভাবনাগুলিও খতিয়ে দেখছেন। বিশেষ করে শৌচাগারের ভিতর থেকে কোনও সুইসাইড নোট উদ্ধার না হওয়া এবং ফেন্টানিলের কয়েকটি ভায়াল তাঁর কাছে পৌঁছনোর বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সুইসাইড নোট না মেলায় প্রশ্ন
রূপালির দেহ যে শৌচাগার থেকে উদ্ধার করা হয়, সেটির দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। কিন্তু সেখানে কোনও সুইসাইড নোট বা লিখিত বার্তা পাওয়া যায়নি। যদিও আত্মহত্যার ঘটনায় চিরকুট থাকা বাধ্যতামূলক নয়, তবুও তদন্তকারীরা তাঁর মানসিক অবস্থা, সাম্প্রতিক আচরণ এবং মৃত্যুর আগে কোনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করছেন।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: সুইসাইড নোট না পাওয়া নিজে থেকে আত্মহত্যার সম্ভাবনা খারিজ করে না। একইভাবে কোনও একটি তথ্যের ভিত্তিতেও মৃত্যুর ঘটনাকে অপরাধ বা আত্মহত্যা হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যায় না। ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং পুলিশের তদন্তের ফলই এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
দাম্পত্য ও ব্যক্তিগত জীবনও তদন্তের আওতায়
রূপালির বিয়ে হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে। তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে কোনও সমস্যা চলছিল কি না, তা জানতে পুলিশ পরিবারের সদস্য এবং ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলছে। তাঁর স্বামীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বা করা হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি, মানসিক নির্যাতন বা অন্য কোনও সমস্যার নির্দিষ্ট প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তাই এসব বিষয়কে আপাতত তদন্তের সম্ভাব্য দিক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
একইসঙ্গে তাঁর কর্মক্ষেত্রের পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। NRS হাসপাতালের HDU-তে কাজের চাপ বা ডিউটি সংক্রান্ত কোনও সমস্যা রূপালির উপর প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা জানতে সহকর্মীদের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত বা পেশাগত চাপের কোনও নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া গিয়েছে—এমন দাবিও এখনও নিশ্চিত নয়।
ফেন্টানিলের ৩টি ভায়াল ঘিরে তদন্ত
রূপালির মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলির মধ্যে রয়েছে ফেন্টানিলের তিনটি ভায়াল। হাসপাতাল সূত্রের দাবি, শৌচাগারে যাওয়ার আগে তিনি HDU-এর নার্সিং স্টেশন থেকে এই ওষুধের ভায়ালগুলি সঙ্গে নিয়েছিলেন। ফেন্টানিল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ওপিওয়েড ওষুধ, যা চিকিৎসাক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়। ফলে হাসপাতালের মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থেকে ওষুধগুলি কীভাবে তাঁর কাছে গেল এবং পরে সেগুলির কী হয়েছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ওষুধের রেজিস্টারে ভায়ালগুলির হিসাব কীভাবে রাখা হয়েছিল, সেগুলি কে ইস্যু করেছিলেন এবং হাসপাতালের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহারের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নও তদন্তে খতিয়ে দেখা হতে পারে। তবে রূপালি নিজে ওষুধটি ব্যবহার করেছিলেন কি না, কিংবা মৃত্যুর সঙ্গে ফেন্টানিলের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায়।
বিষপ্রয়োগ বা অন্য কোনও সম্ভাবনাও কি রয়েছে?
ঘটনাকে ঘিরে বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও, রূপালিকে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ওষুধ প্রয়োগ করেছিলেন বা বিষপ্রয়োগ করা হয়েছিল—এমন কোনও প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তাই এই ধরনের সম্ভাবনাকে আপাতত তদন্তের প্রশ্ন হিসেবেই দেখা উচিত। পুলিশ ঘটনাস্থল, ওষুধের ভায়াল, শারীরিক নমুনা এবং অন্যান্য ফরেনসিক তথ্য মিলিয়ে দেখছে।
- শৌচাগারের ভিতর থেকে রূপালির দেহ উদ্ধার করা হয়।
- ঘটনাস্থল থেকে কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি বলে জানা গিয়েছে।
- হাসপাতাল সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ফেন্টানিলের তিনটি ভায়াল তাঁর সঙ্গে ছিল।
- তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
- ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্টের অপেক্ষা রয়েছে।
মোবাইল ও ডিজিটাল তথ্য খতিয়ে দেখছে পুলিশ
রূপালির মোবাইল ফোনের তথ্যও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। মৃত্যুর আগে তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, শেষ ফোন বা মেসেজ কার সঙ্গে হয়েছিল এবং সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর যোগাযোগের ধরনে কোনও অস্বাভাবিকতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কল ডিটেইলস রেকর্ডের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ডিজিটাল তথ্যও তদন্তকারীরা যাচাই করতে পারেন।
তবে মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি নির্দিষ্ট কারও সঙ্গে কথা বলেছিলেন বা সেই যোগাযোগের সঙ্গে মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি। তদন্তকারীরা তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
ফরেনসিক রিপোর্টেই মিলতে পারে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর
রূপালি বর্মণের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্ত এবং ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। শরীরে কোনও ওষুধ বা রাসায়নিকের উপস্থিতি ছিল কি না, থাকলে তার পরিমাণ কত এবং সেটি মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে। একইসঙ্গে হাসপাতালের ওষুধ ব্যবহারের নথি এবং ঘটনাস্থলের অন্যান্য তথ্যও তদন্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।
এই মুহূর্তে রূপালির মৃত্যু নিয়ে আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা বা অপরাধমূলক ঘটনার কোনও সম্ভাবনাকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরা যাচ্ছে না। পরিবারের বক্তব্য, হাসপাতালের তথ্য, ডিজিটাল যোগাযোগ, ওষুধ সংক্রান্ত নথি এবং ফরেনসিক রিপোর্ট—সবকিছু একসঙ্গে বিশ্লেষণ করার পরই ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব হবে।