ভরণপোষণের আইনি অধিকার: লিভ-ইন পার্টনার কি বিয়ে ছাড়াই অ্যালিমনি বা খোরপোশ দাবি করতে পারেন?
লিভ-ইন সম্পর্ক ও খোরপোশের আইনি ভিত্তি
বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে স্বামী থেকে ভরণপোষণ বা অ্যালিমনি (Alimony) দাবি করা একটি প্রতিষ্ঠিত আইনি অধিকার। তবে বিয়ে না করে লিভ-ইন সম্পর্কে বসবাসকারী কোনো নারী কি বিচ্ছেদের পর সঙ্গীর কাছ থেকে খোরপোশ দাবি করতে পারেন? ভারতীয় আইনি কাঠামো ও সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী—হ্যাঁ, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে একজন লিভ-ইন পার্টনার বিয়ে ছাড়াই খোরপোশ দাবি করার পূর্ণ আইনি অধিকার রাখেন।
দীর্ঘদিন একসাথে বসবাসের পর কোনো নারী যেন হঠাৎ আর্থিক অনটন বা শোষণের শিকার না হন, সেই লক্ষ্যেই ভারতের বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত মানবিক ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে।
খোরপোশ দাবির প্রধান আইনি ভিত্তি ও শর্তাবলী:
- বিয়ের মতো সম্পর্ক (Relationship in the Nature of Marriage): সুদীর্ঘ সময় ধরে একই ছাদের নিচে দম্পতি হিসেবে যৌথ জীবনযাপন করা।
- গার্হস্থ্য হিংসা আইন ২০০৫: এই আইনের ধারা ১২-এর অধীনে ভুক্তভোগী নারী সঙ্গীর কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা বা Monetary Relief দাবি করতে পারেন।
- ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC ১২৫ / BNSS ১৪৪): অসচ্ছল নারীদের সুবিধার্থে সুপ্রিম কোর্টের সম্প্রসারিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী খোরপোশের আবেদন গ্রাহ্য।
- প্রাপ্তবয়স্ক ও অবিবাহিত হওয়া: লিভ-ইন সম্পর্কে থাকাকালীন উভয় সঙ্গীরই অন্য কারো সাথে বৈধ বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা চলবে না।
- আর্থিক নির্ভরশীলতা: বিচ্ছেদের পর নারী সঙ্গীর নিজস্ব উপার্জনের অভাব বা আর্থিক অসংগতি প্রমাণিত হওয়া।
সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা ও আইনগত অবস্থান
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট 'চানমুনিয়া বনাম বীরেন্দ্র কুমার সিং কুশওয়াহা' এবং 'বদ্রি প্রসাদ বনাম ডিরেক্টর অফ কনসলিডেশন'-এর মতো ঐতিহাসিক মামলায় স্পষ্ট করেছে যে, যদি কোনো নারী ও পুরুষ দীর্ঘকাল ধরে স্বামী-স্ত্রীর মতো একসাথে থাকেন, তবে আইন তাঁদের সম্পর্ককে বৈধ হিসেবে ধরে নেয় (Presumption of Marriage)। ফলে পুরুষ সঙ্গী কেবল "বিয়ে হয়নি" এই অজুহাতে নারীকে খোরপোশ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন না।
তবে সুপ্রিম কোর্ট এটাও স্পষ্ট করেছে যে, স্বল্পমেয়াদী লিভ-ইন, ডেটিং বা সাময়িক ওয়ান-নাইট স্ট্যান্ডের ক্ষেত্রে এই আইনের সুযোগ পাওয়া যাবে না। খোরপোশ দাবি করতে হলে সম্পর্কটিকে অবশ্যই দীর্ঘস্থায়ী ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে।
কীভাবে ও কোথায় খোরপোশের দাবি জানাবেন?
লিভ-ইন সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর যদি নারী সঙ্গী আর্থিক সংকটে পড়েন বা নির্যাতনের শিকার হন, তবে তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট বা পারিবারিক আদালতে (Family Court) আবেদন করতে পারেন। ২০০৫ সালের গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধ আইনের অধীনে সরাসরি সুরক্ষা কর্মকর্তা (Protection Officer)-র মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন ও স্থায়ী খোরপোষের পিটিশন দায়ের করা যায়।
আইনি লড়াই চালাতে আর্থিক সমস্যা থাকলে রাজ্য বা জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের (DLSA) কাছে আবেদন জানিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরকারি আইনজীবীর সহায়তা পাওয়া সম্ভব। আইনের এই কল্যাণমুখী ধারাটি প্রতিটি নারীর অর্থনৈতিক সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।