স্টেম বনাম হিউম্যানিটিজ: উচ্চশিক্ষায় বর্তমান পড়ুয়াদের পছন্দ কোন দিকে?

স্টেম বনাম হিউম্যানিটিজ: উচ্চশিক্ষায় বর্তমান পড়ুয়াদের পছন্দ কোন দিকে?

উচ্চশিক্ষায় STEM-এর দিকে কি বাড়ছে ঝোঁক?

উচ্চশিক্ষায় কোন বিষয় বেছে নেবেন—Science, Technology, Engineering and Mathematics বা STEM, নাকি Arts, Humanities ও Social Sciences? বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর একেবারে একমুখী নয়। তবে ভারতের সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, STEM-ভিত্তিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত সর্বশেষ All India Survey on Higher Education বা AISHE-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে ভারতে STEM-এ মোট শিক্ষার্থীসংখ্যা প্রায় ১.০২ কোটিতে পৌঁছেছে, যা এক দশক আগে ২০১৪-১৫ সালের প্রায় ৯১.৫ লক্ষের তুলনায় বেশি।

তবে STEM-এর এই বৃদ্ধি সত্ত্বেও Humanities বা Arts-এর গুরুত্ব কমে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। একই AISHE তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ সালে স্নাতক স্তরে Arts বিভাগেই সর্বাধিক ১.১৫ কোটি শিক্ষার্থী ছিলেন। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখনও মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়কে উচ্চশিক্ষার জন্য বেছে নিচ্ছেন।

কেন STEM-এর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে?

প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সফটওয়্যার, সাইবার নিরাপত্তা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষেত্রের প্রসার STEM শিক্ষাকে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতার চাহিদা থাকবে—এই ধারণাও বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। ভারতের বিদেশমুখী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও STEM ও career-oriented discipline-এর প্রতি শক্তিশালী ঝোঁক দেখা যায়।

তবে শুধু চাকরির সম্ভাবনাই বিষয় নির্বাচনের একমাত্র কারণ নয়। গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ্রহও STEM বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে STEM-এ মোট enrolment উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

  • ২০২৩-২৪ সালে ভারতে STEM-এ প্রায় ১.০২ কোটি শিক্ষার্থী enrolled ছিলেন।
  • ২০১৪-১৫ সালে STEM enrolment ছিল প্রায় ৯১.৫ লক্ষ।
  • ২০২৩-২৪ সালে STEM enrolment-এর ৪৪ শতাংশ ছিলেন মহিলা শিক্ষার্থী।
  • ২০২২-২৩ সালে স্নাতক স্তরে Arts-এ প্রায় ১.১৫ কোটি শিক্ষার্থী ছিলেন।
  • বিষয় নির্বাচনে চাকরির সম্ভাবনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর আগ্রহ, দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

Humanities কি পিছিয়ে পড়ছে?

STEM-এর বৃদ্ধি দেখে Humanities বা Arts-কে অপ্রাসঙ্গিক ভাবার কারণ নেই। ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, ভাষা, সাহিত্য, মনোবিজ্ঞান এবং অন্যান্য মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান এখনও উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, নীতি নির্ধারণ এবং মানুষের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলির ভূমিকা অপরিসীম।

বিশেষ করে আইন, প্রশাসন, সাংবাদিকতা, শিক্ষা, গবেষণা, নীতি নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সৃজনশীল শিল্পের মতো ক্ষেত্রে Humanities-এর ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ফলে কোনও শিক্ষার্থী শুধু STEM-এ চাকরির সুযোগ বেশি বলে নিজের আগ্রহের বিরুদ্ধে গিয়ে সেই বিভাগ বেছে নিলে তা সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে।

বিষয় নির্বাচনে বদলাচ্ছে পুরনো ধারণা

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় STEM এবং Humanities-কে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জগত হিসেবে দেখার প্রবণতাও ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আচরণ, নৈতিকতা, ভাষা, যোগাযোগ এবং সামাজিক প্রভাব বোঝার প্রয়োজন বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নৈতিকতা, আইন, সমাজবিজ্ঞান এবং মানবিক বিষয়গুলির জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ফলে ভবিষ্যতের বহু পেশায় একাধিক ক্ষেত্রের দক্ষতার সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। একজন শিক্ষার্থী কম্পিউটার সায়েন্সের সঙ্গে অর্থনীতি বা ডিজাইনের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারেন। একইভাবে Humanities-এর শিক্ষার্থীরাও ডেটা, ডিজিটাল টুল বা AI-এর মতো প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রাথমিক দক্ষতা অর্জন করে নিজেদের কর্মক্ষেত্রের সুযোগ বাড়াতে পারেন।

মহিলা শিক্ষার্থীদের STEM-এ অংশগ্রহণ বাড়ছে

STEM-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল মহিলা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, STEM enrolment-এ মহিলাদের অংশ ২০১৪-১৫ সালে ৩৮.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে ৪৪ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষায় gender gap কিছুটা কমেছে।

তবে STEM-এর সব শাখায় পরিস্থিতি একই নয়। Science-এ মহিলা শিক্ষার্থীরা পুরুষদের ছাড়িয়ে গেলেও Engineering and Technology-তে এখনও পুরুষ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বেশি। ফলে STEM-এর সামগ্রিক সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন শাখায় সমান সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ক্যারিয়ার দেখে বিষয় নির্বাচন কতটা যুক্তিযুক্ত?

উচ্চশিক্ষার বিষয় বেছে নেওয়ার সময় ভবিষ্যতের চাকরির বাজার বিবেচনা করা প্রয়োজন। কিন্তু শুধু বর্তমানের জনপ্রিয় পেশা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রযুক্তির চাহিদা যেমন দ্রুত বদলাচ্ছে, তেমনই নতুন ধরনের পেশাও তৈরি হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীর নিজের aptitude, আগ্রহ, শেখার ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে সমান গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

শুধু STEM বা শুধু Humanities—কোনও একটিকে সবার জন্য সেরা বলা যায় না। যে শিক্ষার্থী গণিত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বচ্ছন্দ, তার জন্য STEM স্বাভাবিক পছন্দ হতে পারে। অন্যদিকে সমাজ, ভাষা, ইতিহাস, মানুষ ও সংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থীর জন্য Humanities আরও উপযুক্ত হতে পারে। নিজের দক্ষতার সঙ্গে বিষয়টির মিল থাকাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষায় মিশ্র দক্ষতার গুরুত্ব

উচ্চশিক্ষার বর্তমান প্রবণতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—STEM-এর গুরুত্ব বাড়ছে, কিন্তু Humanities-এর প্রয়োজন শেষ হচ্ছে না। বরং ভবিষ্যতের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে interdisciplinary learning-এর গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সঙ্গে যোগাযোগ দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা, নৈতিক বিচারবোধ এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বয় একজন শিক্ষার্থীকে আরও বহুমুখী করে তুলতে পারে।

তাই উচ্চশিক্ষার ধারা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান ট্রেন্ড অনুসরণ করার পাশাপাশি নিজের সক্ষমতা ও আগ্রহকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সর্বশেষ AISHE তথ্য STEM-এর শক্তিশালী বৃদ্ধির ছবি তুলে ধরলেও Arts-এ এখনও বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছেন। অর্থাৎ বর্তমান পড়ুয়াদের পছন্দ STEM-এর দিকে কিছুটা এগোলেও Humanities এখনও উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান ধারা—এবং ভবিষ্যতে দুই ক্ষেত্রের সমন্বয়ই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।