গভীর নিম্নচাপের জেরে টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গ, একাধিক জেলায় সতর্কতা
গভীর নিম্নচাপের জেরে টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গ, একাধিক জেলায় সতর্কতা
উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে টানা ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা। গত সোমবার, ১৭ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে শহরের একাধিক রাস্তা ও নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। জল জমার কারণে বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বেড়েছে।
আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নিম্নচাপের প্রভাব ধীরে ধীরে পশ্চিমের জেলাগুলির দিকে সরে যাচ্ছে। ফলে কলকাতা ও সংলগ্ন কিছু এলাকায় বৃষ্টির তীব্রতা কমার সম্ভাবনা থাকলেও পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম বর্ধমানসহ কয়েকটি জেলায় ভারী থেকে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন কলকাতার একাধিক এলাকা
গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে কলকাতার বিভিন্ন নিচু এলাকায় জল জমে যায়। ঠনঠনিয়া, বালিগঞ্জ, বেলেঘাটা, পাতিপুকুর, উল্টোডাঙা এবং আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ সংলগ্ন এলাকাসহ একাধিক জায়গায় দীর্ঘ সময় জল জমে থাকার খবর পাওয়া গেছে।
উল্টোডাঙা আন্ডারপাসসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও সংযোগস্থলে জল জমার কারণে যানবাহনের গতি কমে যায়। রাসবিহারী কানেক্টর এবং এমজি রোডের মতো ব্যস্ত সড়কেও যানজটের পরিস্থিতি তৈরি হয়। অফিসযাত্রী এবং সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
কোথায় কত বৃষ্টি রেকর্ড?
বিভিন্ন আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এই বৃষ্টিতে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কলকাতার আলিপুরে প্রায় ৫৩ মিলিমিটার, সল্টলেকে প্রায় ৬৪ মিলিমিটার এবং নিউটাউনে প্রায় ৬৮.৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
তবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্থান ও সময়ভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। আবহাওয়া দপ্তরের পরবর্তী আপডেটে এই পরিসংখ্যানের পরিবর্তনও হতে পারে।
ঝাড়খণ্ডের দিকে এগোচ্ছে নিম্নচাপ
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, গভীর নিম্নচাপটি স্থলভাগে প্রবেশের পর দক্ষিণবঙ্গের ওপর দিয়ে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর প্রভাবে ঝাড়খণ্ড ও সংলগ্ন অঞ্চলের দিকে দুর্যোগের প্রভাব বাড়তে পারে।
নিম্নচাপের গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম বর্ধমানের কিছু এলাকায় অত্যন্ত ভারী বৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রামে উচ্চ সতর্কতা
পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম বর্ধমানের কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও ২০ সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলির জন্য পরিস্থিতি অনুযায়ী Red ও Orange Alert জারি করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে সম্ভাব্য জল জমা, বন্যা, ভূমিধস বা অন্যান্য দুর্যোগ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
আজ কলকাতার আবহাওয়া কেমন থাকবে?
আজ বুধবার, ১৯ আগস্ট কলকাতায় সকাল থেকে আকাশ আংশিক মেঘলা থাকতে পারে এবং মাঝে মাঝে রোদের দেখা মিলতে পারে। তবে দিনের পরবর্তী সময়ে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় বজ্রবিদ্যুৎসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুরের কিছু এলাকাতেও বিক্ষিপ্তভাবে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি হতে পারে। আবহাওয়ার পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ সতর্কবার্তার দিকে নজর রাখতে বলা হচ্ছে।
উত্তাল সমুদ্র, মৎস্যজীবীদের জন্য সতর্কতা
নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকার আশঙ্কা রয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় ঘণ্টায় প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ ও নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। যাঁরা ইতিমধ্যে গভীর সমুদ্রে রয়েছেন, তাঁদের নিরাপদ স্থানে ফিরে আসার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
নবান্নের প্রশাসনিক তৎপরতা
দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য প্রশাসনও তৎপর হয়েছে। রাজ্যের মুখ্য সচিব মনোজ আগরওয়াল পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং ঝাড়গ্রাম জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে।
নিচু এলাকা ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে বলা হয়েছে। জমা জল দ্রুত বের করার জন্য পাম্পিং স্টেশনগুলিকে সম্পূর্ণ সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা দলকেও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
কৃষকদের জন্যও সতর্কতা
অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে কৃষিজমি ও উদ্যানপালন ক্ষেত্রের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জমিতে দীর্ঘ সময় জল জমে থাকলে বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে কৃষকদের স্থানীয় কৃষি দপ্তরের পরামর্শ মেনে চলার অনুরোধ করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য কী পরামর্শ?
- অপ্রয়োজনে ভারী বৃষ্টির সময় বাইরে বের হওয়া এড়িয়ে চলুন
- জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালানোর সময় সতর্ক থাকুন
- বজ্রবিদ্যুতের সময় খোলা জায়গা ও গাছের নিচে অবস্থান করবেন না
- জল জমে থাকা এলাকায় বিদ্যুতের তার বা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকুন
- নদী, সমুদ্র ও জলাশয় সংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলুন
- মৎস্যজীবীরা আবহাওয়া দপ্তর ও প্রশাসনের সর্বশেষ সতর্কবার্তা অনুসরণ করুন
শেষ কথা
গভীর নিম্নচাপের জেরে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের জনজীবনে বড় প্রভাব পড়েছে। কলকাতায় বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও পশ্চিমের কয়েকটি জেলায় ভারী থেকে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা এখনও রয়েছে। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে প্রশাসন ও আবহাওয়া দপ্তর। আবহাওয়ার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকা এবং সরকারি নির্দেশ মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।