বারকোড কীভাবে আবিষ্কার হলো, পণ্যের পরিচয় শনাক্ত করার আধুনিক স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ইতিহাস

বারকোড কীভাবে আবিষ্কার হলো, পণ্যের পরিচয় শনাক্ত করার আধুনিক স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ইতিহাস

বারকোড আবিষ্কারের ইতিহাস ও পণ্যের পরিচয়ের সূচনা

সুপারমার্কেটে বা শপিংমলে কেনাকাটা করার সময় ক্যাশ কাউন্টারে পণ্যের গায়ে থাকা কালো ও সাদা সমান্তরাল দাগগুলোর ওপর ছোট লেজার আলো ফেলতেই যখন চোখের পলকে দাম ও নাম স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, তখন তা জাদুকরী মনে হতে পারে। কাগজের গায়ে প্রিন্ট করা এই সাধারণ দাগগুলোই হলো বারকোড (Barcode), যা আধুনিক বাজার ব্যবস্থা এবং সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। মানুষের তৈরি এই সরল অথচ অত্যন্ত কার্যকরী কোডিং পদ্ধতিটি পণ্য শনাক্তকরণের ইতিহাসে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছিল।

বারকোডের আদি ধারণাটি প্রথম মাথাচাড়া দিয়েছিল ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে। ১৯৪৮ সালে ফিলডেলফিয়ার ড্র্যাক্সেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গ্র্যাজুয়েট ছাত্র নরম্যান জোসেফ উডল্যান্ড (Norman Joseph Woodland) এবং বার্নার্ড সিলভার সুপারমার্কেট চেইনের এক নির্বাহীর অনুরোধে দ্রুত পণ্য চেকআউট করার কোনো স্বয়ংক্রিয় উপায় খুঁজতে শুরু করেন। উডল্যান্ড প্রথমে মোর্স কোডের (Morse Code) বিন্দু ও ড্যাশগুলোকে চওড়া ও সরু দাগে রূপান্তরিত করার চিন্তা করেন এবং পরবর্তীতে মোর্স কোডের সেই ধারণাকে বৃত্তাকার বুলস-আই (Bull's-eye) প্যাটার্নে রূপ দিয়ে ১৯৪৯ সালে এর পেটেন্ট লাভ করেন। তবে সেসময় লেজার প্রযুক্তির অভাব ও মুদ্রণ যন্ত্রের সীমাবদ্ধতার কারণে এটি তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ১৯৭৪ সালের ২৬ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও রাজ্যের একটি সুপারমার্কেটে প্রথম 'রিসলেস গম' (Wrigley's Gum) প্যাকেটের ওপর ইউনিভার্সাল প্রোডাক্ট কোড বা ইউপিসি (UPC) বারকোড সফলভাবে স্ক্যান করার মাধ্যমে আধুনিক রিটেল যুগের সূচনা হয়।

  • উডল্যান্ড ও সিলভারের সেই বুলস-আই ডিজাইন পরবর্তীতে জর্জ লরারের তৈরি করা আধুনিক আয়তাকার লিনিয়ার বারকোড বা ইউপিসি (UPC) কোডে রূপান্তরিত হয়।
  • বারকোড আবিষ্কারের ফলেই গুদামজাতকরণ, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট এবং ক্যাশ কাউন্টারে লাইনের দীর্ঘ অপেক্ষা চিরতরে দূর হয়েছে।
  • বর্তমানের সাধারণ লিনিয়ার বারকোড থেকে বিবর্তিত হয়ে আরও বেশি তথ্য ধারণক্ষমতাসম্পন্ন কিউআর কোড (QR Code) এবং টু-ডি বারকোডের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

আধুনিক যুগে বারকোড প্রযুক্তির রূপান্তর ও প্রভাব

নরম্যান উডল্যান্ডের সেই কাগজের ওপর আঁকা আদি মোর্স কোডভিত্তিক প্যাটার্ন থেকে শুরু করে আজকের স্মার্টফোন স্ক্যানার এবং ওয়্যারহাউজের লেজার রিডার—প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বারকোড আজ বিশ্ব বাণিজ্যের অপরিহার্য অংশ। পণ্য উৎপাদক থেকে শুরু করে শেষ ক্রেতা পর্যন্ত সকলের কাছে নিখুঁত তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এর অবদান অনন্য।

সংক্ষেপে, বারকোডের আবিষ্কার মানুষের কেনাকাটার অভিজ্ঞতা এবং বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশকে চিরতরে সহজ ও ত্রুটিমুক্ত করেছে। বিজ্ঞানীদের সেই সুদীর্ঘ সাধনা ও যান্ত্রিক উৎকর্ষ মানব সভ্যতার রিটেল প্রযুক্তিকে এক পরম উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।