পশ্চিমবঙ্গে ISI-যোগের সন্দেহে একাধিক গ্রেফতার, সীমান্ত এলাকায় STF-এর বড় অভিযান

পশ্চিমবঙ্গে ISI-যোগের সন্দেহে একাধিক গ্রেফতার, সীমান্ত এলাকায় STF-এর বড় অভিযান

পশ্চিমবঙ্গে ISI-যোগের সন্দেহে একাধিক গ্রেফতার, সীমান্ত এলাকায় STF-এর বড় অভিযান

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা ও কোচবিহারে পৃথক অভিযানে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা STF। তদন্তকারীদের সন্দেহ, ধৃতদের কয়েকজনের পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা ISI-র সঙ্গে যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তদন্ত এখনও চলছে এবং অভিযোগগুলি আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যাচ্ছে না।

স্বাধীনতা দিবসের আগে ও পরে সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সতর্কতার মধ্যেই এই অভিযানগুলি চালানো হয়। তদন্তে সীমান্ত পারাপার যোগাযোগ, ভারতীয় মোবাইল সিমের অপব্যবহার, সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ এবং আর্থিক লেনদেনের সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে STF ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা।

উত্তর ২৪ পরগনায় পাকিস্তানি নাগরিক গ্রেফতারের অভিযোগ

তদন্তের একটি ঘটনায় উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান চালিয়ে রানা রউফ ওরফে ওয়াহাব আলম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, তিনি পাকিস্তানি নাগরিক এবং দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থান করছিলেন।

প্রাথমিক তদন্তে তাঁর ভারতে প্রবেশ, পরিচয়পত্র সংগ্রহ এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা অভিযোগ খতিয়ে দেখছেন যে, তিনি সংবেদনশীল কিছু তথ্য সংগ্রহ বা পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না।

২০১২ সালে নেপাল হয়ে ভারতে প্রবেশের অভিযোগ

তদন্তকারী সংস্থার প্রাথমিক অভিযোগ অনুযায়ী, ধৃত ব্যক্তি ২০১২ সালে নেপাল হয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। পরে জালিয়াতির মাধ্যমে ভারতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে দীর্ঘদিন দেশে অবস্থান করার অভিযোগও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে। পুলিশ বর্তমানে তাঁর পরিচয়, নথিপত্র এবং যোগাযোগের সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক যাচাই করছে।

সেনা ও রেল সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য পাচারের সন্দেহ

তদন্তকারীদের সন্দেহ, ওই ব্যক্তি ভারতীয় সেনাবাহিনী, রেল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার গতিবিধি বা সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। এই তথ্য বিদেশে বা সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তের স্বার্থে উদ্ধার হওয়া মোবাইল, ডিজিটাল ডিভাইস, নথিপত্র এবং যোগাযোগের তথ্য ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হতে পারে।

রিষড়া ও কলকাতা থেকেও সহযোগী গ্রেফতার

উত্তর ২৪ পরগনার ঘটনার তদন্তে আরও কয়েকজন সম্ভাব্য সহযোগীর সন্ধান মেলে বলে তদন্তকারীদের দাবি। এই সূত্র ধরে হুগলির রিষড়া এবং কলকাতার তপসিয়া এলাকা থেকেও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তদন্তে দেখা হচ্ছে, তাঁরা ধৃত ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া, পরিচয় গোপন করতে সাহায্য করা অথবা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনায় কোনও ভূমিকা রেখেছিলেন কি না। তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, পেট্রাপোল সীমান্ত ব্যবহার করে পালানোর সম্ভাব্য পরিকল্পনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কোচবিহারের সীমান্ত এলাকায় STF-এর চিরুনি তল্লাশি

অন্যদিকে, কোচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জ ও দিনহাটা এলাকার সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও পৃথক অভিযান চালিয়েছে STF। উত্তর ২৪ পরগনার তদন্ত থেকে পাওয়া সম্ভাব্য তথ্য ও অন্যান্য গোয়েন্দা সূত্রের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

সাহেবগঞ্জ এলাকা থেকে রাশিদুল হক, নূর নাসিরুদ্দিন আলী এবং মহম্মদ শফিকুল ইসলাম নামে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয় বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের ভিত্তিতে দিনহাটার দীঘলটারি এলাকা থেকে মিঠু রহমান নামে আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয়।

জাল ও বেনামী SIM Card ব্যবহারের অভিযোগ

তদন্তকারীদের অভিযোগ, এই চক্রটি অন্য ব্যক্তির নথি ব্যবহার করে একাধিক ভারতীয় মোবাইল SIM Card সংগ্রহ করত। এরপর ওই নম্বরগুলি বিভিন্ন অনলাইন যোগাযোগ পরিষেবায় ব্যবহার করা হতো।

প্রাথমিক তদন্তে আরও অভিযোগ উঠেছে যে, SIM Card সক্রিয় করার জন্য প্রয়োজনীয় OTP বা One-Time Password বিদেশে থাকা সন্দেহভাজন হ্যান্ডলারদের কাছে পাঠানো হতো। তবে এই অভিযোগগুলির পূর্ণাঙ্গ সত্যতা এখনও তদন্তাধীন।

ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নম্বরে যোগাযোগের অভিযোগ

তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এই SIM Card ব্যবহার করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বা সংবেদনশীল নম্বরে যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না। বিদেশ থেকে পরিচালিত কোনও সংগঠিত নেটওয়ার্ক এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ডিজিটাল যোগাযোগের তথ্য, কল রেকর্ড এবং আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করে পুরো নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।

ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক অর্থ লেনদেনের তদন্ত

তদন্তে ধৃতদের কয়েকজনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ আসার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই অর্থ কোনও বৈধ লেনদেনের অংশ ছিল, নাকি সন্দেহভাজন বেআইনি কার্যকলাপের জন্য পাঠানো হয়েছিল, তা যাচাই করছে তদন্তকারী সংস্থা।

প্রয়োজনে ব্যাঙ্ক লেনদেন, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং অন্যান্য আর্থিক নথি পরীক্ষা করে অর্থের উৎস ও গন্তব্য চিহ্নিত করা হবে।

জালনোট চক্রের সম্ভাব্য যোগসূত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে

তদন্ত চলাকালে উদ্ধার হওয়া নথি, মোবাইল এবং অন্যান্য সামগ্রীর সূত্র ধরে উত্তরবঙ্গ ও বিহারের কিছু এলাকায় সক্রিয় জাল ভারতীয় মুদ্রা বা Fake Indian Currency Notes (FICN) চক্রের সম্ভাব্য যোগসূত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে চরবৃত্তির অভিযোগ এবং জালনোট সংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে সরাসরি ও নিশ্চিত সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বলা সম্ভব নয়। তদন্তকারীরা সমস্ত সূত্র আলাদাভাবে যাচাই করছেন।

উদ্ধার হয়েছে SIM Card, মোবাইল ও নথিপত্র

বিভিন্ন অভিযানে তদন্তকারীরা একাধিক ভারতীয় SIM Card, মোবাইল ফোন এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র উদ্ধার করেছেন বলে জানা গেছে। এগুলির ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষা করে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

তদন্তকারীদের লক্ষ্য এখন এই নেটওয়ার্ক কতদিন ধরে সক্রিয় ছিল, এর সঙ্গে আর কারা যুক্ত ছিলেন এবং সীমান্তের দুই পাশ বা অন্য কোনও দেশের সঙ্গে এর যোগাযোগ ছিল কি না, তা চিহ্নিত করা।

১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ

কোচবিহার থেকে গ্রেফতার হওয়া কয়েকজন অভিযুক্তকে আদালতে তোলা হলে তদন্তের প্রয়োজনে পুলিশি হেফাজতের আবেদন করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আদালত তাঁদের ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে।

এই সময়ের মধ্যে STF ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ, ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সন্ধানে তদন্ত আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

তদন্তে যুক্ত অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা

সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য বিদেশি যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আসায় কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পর্যায়ের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও বিষয়টির ওপর নজর রাখছে। স্বাধীনতা দিবসের সময় নিরাপত্তা আরও জোরদার করার পাশাপাশি কোনও সংবেদনশীল সরকারি তথ্য ফাঁস হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শেষ কথা

উত্তর ২৪ পরগনা ও কোচবিহারে STF-এর এই অভিযান সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য গুপ্তচরবৃত্তি নেটওয়ার্ক নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তদন্তকারীদের দাবি ও সন্দেহের ভিত্তিতে একাধিক গ্রেফতার হলেও তদন্ত এখনও চলছে। ISI-যোগ, গুপ্তচরবৃত্তি, SIM Card অপব্যবহার, আর্থিক লেনদেন এবং সম্ভাব্য জালনোট চক্রের সমস্ত অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।