কলকাতায় CJP-র একের পর এক সভা বাতিল, বিজেপির বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ
কলকাতায় CJP-র একের পর এক সভা বাতিল, বিজেপির বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ
কলকাতায় ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP-র একাধিক সভা ও সাংবাদিক বৈঠক শেষ মুহূর্তে বাতিল হওয়াকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। CJP-র অভিযোগ, নবগঠিত বিজেপি সরকারের চাপ এবং বিজেপি নেতাদের হুমকির কারণেই শহরের একাধিক হল কর্তৃপক্ষ তাঁদের বুকিং বাতিল করেছে। যদিও বিজেপি এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে এবং হল বাতিলের সঙ্গে সরকারের কোনও যোগ নেই বলে দাবি করেছে।
একাধিক জায়গায় সভা বাতিলের অভিযোগ
১৮ আগস্ট কলকাতায় CJP-র একাধিক কর্মসূচি হওয়ার কথা ছিল। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘স্কুল ঠিক করো’ বা School Thik Karo নামে দেশব্যাপী একটি প্রচারাভিযানের রূপরেখা এবং পশ্চিমবঙ্গে তাদের এক কর্মীর পরিবারের সদস্যের মৃত্যুর প্রতিবাদে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল।
CJP-র দাবি, কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করার জন্য হল বুক করা হলেও একের পর এক কর্তৃপক্ষ শেষ মুহূর্তে বুকিং বাতিল করে দেয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অন্তত ছয়টি জায়গায় এমন ঘটনা ঘটেছে।
‘পাওয়ার কাট’-কে কেন্দ্র করে বিতর্ক
কলকাতা প্রেস ক্লাবেও CJP-র সাংবাদিক বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বুকিং বাতিল হয়ে যায় এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল বলে CJP-র অভিযোগ। সংগঠনের নেতারা অবশ্য এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ করেন।
তবে প্রেস ক্লাব বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বুকিং বাতিলের কারণ নিয়ে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সেটি এবং CJP-র রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ—দুই দিকই আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিজেপির পক্ষ থেকে সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগও অস্বীকার করা হয়েছে।
ছয়টি হলের মালিককে হুমকির অভিযোগ
CJP-র সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা অভিযোগ করেছেন, বিজেপি নেতারা কলকাতার অন্তত ছয়টি হলের মালিক বা কর্তৃপক্ষকে ফোন করে তাঁদের অনুষ্ঠান করার জায়গা না দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন। তাঁর দাবি, এই কারণেই একের পর এক বুকিং বাতিল করা হয়েছে।
এই অভিযোগের সমর্থনে CJP-র পক্ষ থেকে আরও তথ্য প্রকাশের দাবি করা হলেও বিজেপি নেতৃত্ব এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। ফলে হল বুকিং বাতিলের প্রকৃত কারণ নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর অব্যাহত রয়েছে।
হল না পেয়ে রাস্তায় সাংবাদিক বৈঠক
হল না পাওয়ার পর CJP নেতৃত্ব কর্মসূচি বাতিল না করে কলকাতা প্রেস ক্লাবের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন। ব্যানার হাতে সংগঠনের কর্মী ও সমর্থকেরা সেখানে প্রতিবাদ জানান এবং নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ্যে তুলে ধরেন।
CJP নেতৃত্বের বক্তব্য, জায়গা না দিলেও তাঁদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রচার বন্ধ করা যাবে না। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে যত বেশি চাপ তৈরি হবে, তত বেশি যুবসমাজ তাঁদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হবে।
‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য
CJP-র কলকাতা কর্মসূচির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করা। সংগঠনের দাবি, রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার মান এবং স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয় নিয়ে তারা রাজ্যজুড়ে প্রচার চালাবে।
এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন সরকারি স্কুলে গিয়ে পরিকাঠামো ও শিক্ষাব্যবস্থার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার পরিকল্পনার কথাও সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ছাত্র, শিক্ষক ও যুবসমাজকে এই প্রচারে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে CJP জানিয়েছে।
বাঁকুড়ার ঘটনা নিয়ে CJP-র অভিযোগ
কলকাতায় আয়োজিত কর্মসূচির সঙ্গে বাঁকুড়ার একটি ঘটনাও যুক্ত রয়েছে বলে CJP জানিয়েছে। সংগঠনের অভিযোগ, ইন্দাস এলাকায় তাদের এক তরুণ কর্মীর পরিবারের সদস্য শেখ মহম্মদ মফিককে স্থানীয় বিজেপি-ঘনিষ্ঠ দুষ্কৃতীরা মারধর করে হত্যা করেছে।
CJP-র দাবি, ওই তরুণ একটি সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে ‘স্কুল অডিট’ করতে যাওয়ার পর তাঁর পরিবারের ওপর হামলা হয়। তবে এই অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনের সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়।
এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের দাবি
বাঁকুড়ার ঘটনায় মৃত ব্যক্তির পরিবারের জন্য ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ এবং অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে CJP। সংগঠনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জেলাশাসকের দপ্তর ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনাকে সামনে রেখে CJP রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সরকারি স্কুলগুলির পরিস্থিতি নিয়ে আরও বড় আন্দোলনের ডাক দিয়েছে।
সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন
CJP-র নেতাদের দাবি, রাজ্যের বহু সরকারি স্কুলে পরিকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা জমেছে। তাঁরা প্রতিটি সরকারি স্কুলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবি তোলার কথা জানিয়েছেন।
পাশাপাশি বেসরকারি স্কুলের ফি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়ানোর মতো বিষয়ও তাদের প্রচারের অংশ বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিজেপির পাল্টা বক্তব্য
অন্যদিকে রাজ্য বিজেপি CJP-র সমস্ত অভিযোগ খারিজ করেছে। বিজেপির বক্তব্য, কলকাতার বিভিন্ন হলের বুকিং বাতিলের সঙ্গে রাজ্য সরকারের কোনও সম্পর্ক নেই এবং এটি সংশ্লিষ্ট হল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক সমস্যার বিষয়।
বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, রাজনৈতিক প্রচারের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। CJP-র অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ সামনে না আসা পর্যন্ত এই দাবিগুলিকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই দেখা উচিত বলে বিজেপির পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
আরএসএস ও দিলীপ ঘোষের কটাক্ষ
CJP-র আন্দোলন নিয়ে বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষও কটাক্ষ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে আন্দোলনটির পেছনে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মদতের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে CJP ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে। CJP নিজেদের একটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিজেপি তাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
Gen-Z আন্দোলন হিসেবে CJP-র পরিচিতি
ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP নিজেদের একটি ব্যঙ্গাত্মক ও নতুন প্রজন্মকেন্দ্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তরুণদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামাজিক ইস্যু নিয়ে প্রচার চালানোর মাধ্যমে সংগঠনটি পরিচিতি পেয়েছে।
কলকাতায় একের পর এক সভা বাতিলের ঘটনা সংগঠনটির প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁদের দাবি, প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক চাপ দিয়ে কোনও আন্দোলনের কণ্ঠস্বর বন্ধ করা সম্ভব নয়।
ঘটনাকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলি উঠছে
- কলকাতার একাধিক হলের বুকিং কেন শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হলো?
- বুকিং বাতিলের সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক চাপ ছিল কি না
- বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা হুমকির অভিযোগের কোনও প্রমাণ রয়েছে কি না
- ‘পাওয়ার কাট’ দেখিয়ে প্রেস ক্লাবের বুকিং বাতিলের প্রকৃত কারণ কী
- বাঁকুড়ার ঘটনায় রাজনৈতিক যোগের অভিযোগ কতটা সত্য
- ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলন কতটা রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত হবে
- CJP-র কর্মসূচিতে ছাত্র ও যুবসমাজের অংশগ্রহণ কতটা বাড়বে
- রাজ্য সরকার বা প্রশাসন এই অভিযোগ নিয়ে কোনও তদন্ত করবে কি না
- বিজেপির পাল্টা অভিযোগের ভিত্তি কী
- আগামী দিনে CJP-র আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা হবে
শেষ কথা
কলকাতায় ককরোচ জনতা পার্টির একাধিক সভা ও সাংবাদিক বৈঠক বাতিল হওয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর নতুন মাত্রা পেয়েছে। CJP যেখানে বিজেপি সরকারের চাপ ও হুমকির অভিযোগ তুলেছে, সেখানে বিজেপি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। হল বাতিলের প্রকৃত কারণ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ কতটা সত্য, তা স্পষ্ট হওয়ার জন্য আরও তথ্য ও প্রমাণের প্রয়োজন। একইসঙ্গে ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলন এবং বাঁকুড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে CJP আগামী দিনে কী ধরনের কর্মসূচি নেয়, সেদিকেও নজর থাকবে।