কৃষিতে দালাল চক্রের মায়াজাল: ঘাম ঝরিয়েও ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না প্রান্তিক চাষিরা
ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত চাষি: অন্তরালে দালাল চক্র
রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাঠের পর মাঠ ফসল ফলান যে কৃষক, দিনশেষে তার পকেটেই থাকে টান। পাইকারি বা খুচরা বাজারে যখন শাকসবজি ও ফসলের দাম আকাশছোঁয়া, তখন মাঠ পর্যায় থেকে পানির দরে কেনা হচ্ছে সেই একই পণ্য। প্রখর পরিশ্রমের পরেও কৃষকদের এই আকুলতার মূল কারণ বাজারজুড়ে গেড়ে বসা শক্তিশালী দালাল চক্র ও ফড়িয়া রাজ। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ গ্রাহকরা যেমন চড়া দামে কেনাকাটা করছেন, তেমনই মূল উৎপাদক কৃষক পাচ্ছেন না তাদের ঘামের সঠিক মূল্য।
কৃষি বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রান্তিক চাষিদের নিজস্ব পরিবহণ ব্যবস্থা না থাকা এবং সরাসরি খুচরা বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ না থাকাকে কাজে লাগায় এই সিন্ডিকেট। চাষের মরসুমে বিপুল পরিমাণ ফসল একসঙ্গে উঠলে বাজারে কৃত্রিম মন্দা তৈরি করা হয়। ফলে বাধ্য হয়ে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে দালালদের হাতে ফসল তুলে দিতে হয় চাষি ভাইদের।
ন্যায্য দাম না পাওয়ার প্রধান কারণসমূহ:
- সরাসরি বাজারজাতকরণের অভাব: চাষি থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে ফসল পৌঁছানোর মতো পরিকাঠামোর ঘাটতি।
- সংরক্ষণাগারের সংকট: পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ বা হিমঘর না থাকায় পচনশীল ফসল দ্রুত কম দামে বিক্রি করার বাধ্যবাধকতা।
- ঋণের বাঁধাধরা ফাঁদ: চাষের শুরুতেই ফড়িয়া বা মহাজনদের কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে রাখা, যার বিনিময়ে কম দামে ফসল দিতে হয়।
- তথ্য ও যোগাযোগে পিছিয়ে থাকা: বিভিন্ন বড় শহরের পাইকারি বাজারের সঠিক দরদাম সম্পর্কে চাষিদের স্বচ্ছ ধারণার অভাব।
শৃঙ্খল ভাঙার চেষ্টা ও সম্ভাব্য সমাধান
দালাল চক্রের মায়াজাল কাটাতে এবং চাষিদের স্বার্থ রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে দাবি উঠে আসছে স্থায়ী ব্যবস্থার। সরাসরি কৃষক বাজার বা 'কৃষক মান্ডি' তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রেই ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্যে তা পুরোপুরি সফল হতে পারছে না। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অ্যাপের সাহায্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে সরাসরি ক্রেতা বা বড়ো পাইকারদের সাথে কৃষকদের সংযোগ ঘটানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি সমবায় সমিতি গঠন করে নিজস্ব পরিবহণে ফসল সরবরাহের মাধ্যমে দালালি প্রথা উচ্ছেদে উদ্যোগী হচ্ছেন তরুণ চাষিরা। সরকারি নজরদারি জোরদার এবং হিমঘরের সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে তবেই কৃষক তাদের পরিশ্রমের প্রকৃত মর্যাদা পাবেন।