মহাকাশচারীরা মহাকাশে ভেসে থাকেন কেন? জানুন বৈজ্ঞানিক কারণ ও শূন্য অভিকর্ষের রহস্য
মহাকাশচারীরা মহাকাশে ভেসে থাকেন কেন? জেনে নিন বৈজ্ঞানিক কারণ
মহাকাশ স্টেশন বা মহাশূন্যে নভোচারীদের মাটি থেকে ওপরে উঠে শূন্যে ভেসে থাকার দৃশ্য সবসময়ই আমাদের মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে—মহাকাশে ঠিক কী কারণে মানুষের শরীর ও বস্তুগুলো মাধ্যাকর্ষণের বাইরে চলে গিয়ে এমন অদ্ভুতভাবে ভেসে বেড়ায়, এই প্রশ্ন মানব সভ্যতার মনে চিরকাল এক দারুণ কৌতূহল জাগিয়ে এসেছে; মহাকর্ষ ও গতির এই রহস্য একদিনে উন্মোচিত হয়নি। মানুষের দীর্ঘদিনের নিউটনিয়ান মেকানিক্স, অ্যাস্ট্রোফিজিক্স এবং আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির হাত ধরেই মাইক্রোগাভিটি বা শূন্য অভিকর্ষের এই নিখুঁত প্রক্রিয়া বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট হয়েছিল। বর্তমান যুগে স্পেস স্টেশন ডিজাইন, অরবিটাল ফিজিক্স এবং মানব শরীরবৃত্তীয় গবেষণার প্রতিটি ক্ষেত্রে এই মুক্ত পতনের অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃতির এই অসামান্য মহাজাগতিক রূপ মানব সভ্যতাকে আমাদের গ্রহের গ্র্যাভিটেশনাল ফিল্ড এবং অরবিটাল ডাইনামিকস সিস্টেমের সাথে পরিচয় করিয়েছে। এর নেপথ্যে কাজ করেছে দীর্ঘ দশকের নিরলস ফ্রি-ফল (Free-Fall) এবং মাইক্রোগাভিটি অ্যানালাইসিস গবেষণা।
মহাকাশচারীরা মহাকাশে ভেসে থাকেন কেন তার সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া আবিষ্কারের ইতিহাস শুরু হয়েছিল আধুনিক পদার্থবিদ্যা এবং মহাকাশ গবেষণার হাত দিয়ে, যার মাধ্যমে মাধ্যাকর্ষণ বল ও কক্ষপথের গতির সম্পর্ক প্রথম নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভব হয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী, এর মূল প্রক্রিয়াটি হলো: আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS) বা কৃত্রিম উপগ্রহগুলো যখন পৃথিবীকে খুব দ্রুত গতিতে (ঘণ্টায় প্রায় ২৮,০০০ কিলোমিটার) প্রদক্ষিণ করে, তখন স্টেশনটি এবং তার ভেতরের সবকিছু অবিরাম পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে মুক্ত পতন বা ফ্রি-ফলের (Free-Fall) অবস্থায় থাকে; এই চরম গতির কারণে মহাকাশচারী ও মহাকাশযান একই সাথে সমান ত্বরণে নিচে পড়তে থাকায় সেখানে আপেক্ষিক ওজনহীনতা বা মাইক্রোগাভিটির সৃষ্টি হয়, যার ফলে নভোচারীরা মহাশূন্যে অনায়াসে ভেসে থাকেন।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী মহাকাশ স্টেশনে পুরোপুরি মাধ্যাকর্ষণ শূন্য নয় (পৃথিবীর টানের প্রায় ৯০ শতাংশ সেখানে কাজ করে), কিন্তু অবিরাম কক্ষপথের গতির কারণে তৈরি হওয়া ফ্রি-ফল অবস্থার জন্যই নভোচারীরা নিজেদের ওজনহীন ও ভাসমান অনুভব করেন।
- মহাকাশ স্টেশনটি অত্যন্ত উচ্চ বেগে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করায় এটি ও এর ভেতরের সবকিছু সর্বদা মহাশূন্যে মুক্ত পতনের মধ্যে থাকে।
- মহাকর্ষ বল অদৃশ্য হয়ে যায় না, বরং কক্ষপথের বেগ ও অভিকর্ষ বলের সুষম ভারসাম্যের কারণে সেখানে ভাসমান অবস্থার সৃষ্টি হয়।
- দীর্ঘদিন এই ভাসমান অবস্থায় থাকার ফলে মহাকাশচারীদের পেশি ও হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার মতো শারীরিক পরিবর্তন ঘটে।
পদার্থবিদ্যা ও মহাকাশ গবেষণার প্রভাব
মহাকাশচারীদের ওজনহীনতা ও কক্ষপথের গতিপ্রকৃতি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সেই আদি সময় থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক স্পেস স্টেশন ও মানববাহী মিশন—প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের পদার্থবিদ্যা ও মহাকাশ বিজ্ঞানের জ্ঞানের দিগন্ত আজ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ যাত্রায় নভোচারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা, কৃত্রিম উপগ্রহের কক্ষপথ নিয়ন্ত্রণ এবং মহাকর্ষীয় বল অনুধাবনের ক্ষেত্রে এই গবেষণার অবদান সবচেয়ে বেশি। সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রযুক্তি বিজ্ঞানজগতে গভীর বিপ্লব ঘটিয়েছিল। প্রতিদিনের পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা কিংবা মহাকাশ বিজ্ঞান—সবক্ষেত্রেই এর গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়।
সংক্ষেপে, মহাকাশচারীরা মহাকাশে ভেসে থাকেন কেন তার সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য আবিষ্কার আধুনিক পদার্থবিদ্যা ও মহাকাশ বিজ্ঞানের নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটিয়ে আমাদের মহাশূন্যের গতিশীলতাকে নতুনভাবে বুঝতে শিখিয়েছে। বিজ্ঞানীদের সেই সুদীর্ঘ সাধনা ও মহাজাগতিক গবেষণার ইতিহাস ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আগামী দিনের মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তির উন্নয়নেও এই অরবিটাল রিসার্চ এক প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে যাবে।