চেক ডিজঅনার মামলা: লেনদেনে আইনি জটিলতা, শাস্তি ও বাঁচার উপায়

চেক ডিজঅনার মামলা: লেনদেনে আইনি জটিলতা, শাস্তি ও বাঁচার উপায়

চেক ডিজঅনার ও ১৮৮১ সালের এনআই অ্যাক্ট

ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা ব্যক্তিগত পাওনা মেটাতে চেক (Cheque) লেনদেনের ব্যবহার অত্যন্ত ব্যাপক। তবে কোনো কারণে ব্যাংক থেকে চেক প্রত্যাখ্যাত বা অকার্যকর হলে যে আইনি জটিলতা তৈরি হয়, তাকেই চেক বাউন্স বা চেক ডিজঅনার বলা হয়। ভারতে চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলা নিয়ন্ত্রিত হয় ১৮৮১ সালের 'নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট' (Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ১৩৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী। ব্যাংকে অপর্যাপ্ত তহবিল বা অন্যান্য ত্রুটির কারণে চেক বাউন্স হওয়াকে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

যেকোনো চেক প্রদানের ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য থাকে দেনা বা আইনগত দায় শোধ করা। কিন্তু চেক ডিজঅনার হলে পাওনাদারের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি চেক প্রদানকারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি মামলা দায়ের হতে পারে।

চেক ডিজঅনার হওয়ার প্রধান কারণসমূহ:

  • অপর্যাপ্ত অর্থ (Insufficient Funds): অ্যাকাউন্টে চেকের উল্লেখিত অঙ্কের সমপরিমাণ অর্থ না থাকা।
  • স্বাক্ষরের অমিল (Signature Mismatch): ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মূল স্বাক্ষরের সঙ্গে চেকের স্বাক্ষরের অসামঞ্জস্য।
  • অ্যালাউড লিমিট অতিক্রম: চালুর নির্ধারিত লেনদেন সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া।
  • অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকা: যে অ্যাকাউন্ট থেকে চেক দেওয়া হয়েছে সেটি ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া।
  • অর্থ প্রদানে স্থগিতাদেশ (Stop Payment): চেক প্রদানকারী কর্তৃক ব্যাংকে অর্থ পেমেন্ট না করার নির্দেশ।

আইনি প্রক্রিয়ার পদক্ষেপ ও নোটিশ পাঠানোর নিয়ম

ব্যাংকে চেক জমা দেওয়ার পর তা ডিজঅনার হলে ব্যাংক থেকে একটি 'মেমো' (Cheque Return Memo) প্রদান করা হয়, যেখানে চেক বাউন্সের সুনির্দিষ্ট কারণ লেখা থাকে। পাওনাদার বা চেক গ্রহীতাকে এই মেমো পাওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে চেক প্রদানকারীকে একটি আইনি নোটিশ (Legal Demand Notice) পাঠাতে হয়।

আইনি নোটিশে নোটিশ প্রাপ্তির ১৫ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ করার সুযোগ দিতে হয়। যদি নোটিশ পাওয়ার পর উক্ত ১৫ দিনের মধ্যে পাওনা টাকা পরিশোধ না করা হয়, তবে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে পাওনাদার ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট ধারা ১৩৮ অনুযায়ী সরাসরি ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে পারেন।

আইনি শাস্তি ও অযাচিত ঝামেলা থেকে বাঁচার উপায়

নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড, চেকের মূল অঙ্কের দ্বিগুণের সমান অর্থ জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। এটি একটি জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য (Compoundable) অপরাধ, ফলে মামলার যেকোনো পর্যায়ে দু'পক্ষ সম্মত হলে আপস নিষ্পত্তি করা সম্ভব।

চেক বাউন্স মামলা ও আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতে লেনদেনের সময় সর্বদা সতর্ক হওয়া উচিত। ব্যাংকে পর্যাপ্ত ব্যালেন্স না থাকলে কাউকে চেক প্রদান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এছাড়া কোনো নিরাপত্তার খাতিরে বা ব্ল্যাঙ্ক চেক (Blank Cheque) প্রদানের সময় সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রমাণ বা রসিদ রাখা অত্যন্ত জরুরি। অহেতুক আইনি ঝামেলা এড়াতে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আইনি নোটিশের সঠিক জবাব নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে প্রদান করা বুদ্ধিমানের কাজ।