মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় ফের ঊর্ধ্বমুখী অপরিশোধিত তেলের দাম, বাড়ছে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় তেলের বাজারে অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহপথে বাধার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ২১ অগস্টের বাজারে Brent Crude সামান্য কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৩.৪৪ ডলারে থাকলেও সপ্তাহের হিসাবে দাম ৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে মার্কিন WTI অপরিশোধিত তেল প্রায় ৮৬.৭৬ ডলারে লেনদেন হয়েছে এবং এক সপ্তাহে এর দামও ৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফলে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তেলের বাজারে সাম্প্রতিক এই ঊর্ধ্বগতির অন্যতম কারণ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং ইরানকে ঘিরে অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে Strait of Hormuz দিয়ে তেল পরিবহণ স্বাভাবিকের তুলনায় এখনও অনেক কম থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক দেশগুলির একটি অংশ এই অঞ্চলে থাকায় পরিবহণে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমান বাজারের চিত্র: ২০ অগস্ট Brent crude-এর দাম ২.৪ শতাংশ বেড়ে ৯৩.৭৮ ডলারে পৌঁছেছিল, যা ২৪ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ স্তর। একই দিনে WTI ২.৩ শতাংশ বেড়ে ৮৭.৮৩ ডলারে স্থির হয়। পরদিন সামান্য দরপতন হলেও সাপ্তাহিক হিসাবে দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
- Brent crude ২১ অগস্ট প্রায় ৯৩.৪৪ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
- WTI crude প্রায় ৮৬.৭৬ ডলারে ছিল।
- এক সপ্তাহে Brent-এর দাম ৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
- এক সপ্তাহে WTI-এর দাম ৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
- Strait of Hormuz দিয়ে তেল পরিবহণ স্বাভাবিকের তুলনায় এখনও কম রয়েছে।
সরবরাহ নিয়ে কেন বাড়ছে আশঙ্কা?
অপরিশোধিত তেলের বাজারে দামের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হল সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে উৎপাদন ও পরিবহণে ব্যাঘাত ঘটলে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তেলের দাম দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। সাম্প্রতিক তথ্যেও এই জলপথে জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় অনেক কম থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনার অনিশ্চয়তা। কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা দুর্বল হলে বাজারে সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে। ২০ অগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সমর্থনকারী দেশগুলির বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরও তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
OPEC-এর ভূমিকা নিয়েও নজর
অপরিশোধিত তেলের বাজারে OPEC এবং OPEC+-এর উৎপাদন নীতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন কমানো বা সরবরাহ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারে দামের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। OPEC এবং International Energy Agency উভয়েই ২০২৬ সালের তেলের চাহিদা বৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে, যা একদিকে দাম বৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমাতে পারে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ঝুঁকি সেই প্রভাবকে অনেকটাই ভারসাম্যহীন করে দিচ্ছে।
ফলে বর্তমানে তেলের বাজারে দুটি বিপরীত প্রবণতা কাজ করছে। একদিকে দুর্বল চাহিদার পূর্বাভাস এবং কিছু অঞ্চলে পর্যাপ্ত মজুত দাম বৃদ্ধির গতি কমাতে পারে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে পরিবহণের সমস্যা এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাজারে ঝুঁকির প্রিমিয়াম বাড়াচ্ছে।
ভারতের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘসময় তেলের দাম বেশি থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বৈদেশিক বাণিজ্য, মুদ্রাস্ফীতি এবং জ্বালানি অর্থনীতির উপর। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেই দেশের পেট্রল-ডিজেলের দাম একই হারে বাড়বে—এমন সরল সম্পর্ক নেই। কর, বিনিময় হার, তেল বিপণন সংস্থার মূল্য নির্ধারণ এবং সরকারের নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক হয়, সেটিই তেলের বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি হতে পারে। সংঘাত ও সরবরাহ সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে অপরিশোধিত তেলের দামে আরও ঊর্ধ্বচাপ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে কূটনৈতিক সমাধান এবং পরিবহণ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে বাজারে সরবরাহের আশঙ্কা কমে দামও কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার সুযোগ রয়েছে।