জলবায়ু পরিবর্তনে নতুন এলাকায় ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি, ক্রান্তীয় রোগ মোকাবিলায় সতর্ক WHO
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যত বাড়ছে, ততই পরিবর্তিত হচ্ছে মশাবাহিত ও অন্যান্য ভেক্টর-বাহিত রোগের বিস্তারের ধরন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন এবং আর্দ্রতার ওঠানামা মশার প্রজনন ও রোগজীবাণুর সংক্রমণচক্রকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ নতুন নতুন ভৌগোলিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHOও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ম্যালেরিয়া ও অবহেলিত ক্রান্তীয় রোগের বিস্তারে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা ও প্রস্তুতি জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
WHO-র মতে, Neglected Tropical Diseases বা NTDs-এর মধ্যে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো ভেক্টর-বাহিত রোগও রয়েছে। এই রোগগুলির বিস্তার পরিবেশ, জলবায়ু, মশার উপস্থিতি এবং মানুষের বসবাসের পরিস্থিতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে রোগবাহী মশার ভৌগোলিক বিস্তার বদলে যেতে পারে, যার ফলে আগে তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ কিছু এলাকাতেও সংক্রমণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
WHO-এর গুরুত্বপূর্ণ বার্তা: জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাওয়া রোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, মশা নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব এলাকায় রোগবাহী মশার বিস্তার নতুন করে দেখা দিতে পারে, সেখানে আগে থেকেই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
- তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিবর্তন মশাবাহিত রোগের বিস্তারে প্রভাব ফেলতে পারে।
- ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ নতুন ভৌগোলিক এলাকায় পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে।
- ম্যালেরিয়ার সংক্রমণও জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে প্রভাবিত হতে পারে।
- মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ এবং রোগের নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ।
- দ্রুত রোগ নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রস্তুতি জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
কেন জলবায়ু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ?
মশার জীবনচক্র এবং রোগজীবাণুর সংক্রমণ ক্ষমতার সঙ্গে পরিবেশের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার সম্পর্ক রয়েছে। উষ্ণ পরিবেশ কিছু মশার প্রজনন ও বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বা অনিয়মিত বৃষ্টিপাত জমা জল তৈরি করলে মশার প্রজননস্থল বাড়তে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, জলবায়ুর পরিবর্তন কিছু ভেক্টর-বাহিত রোগের সংক্রমণ মৌসুম ও ভৌগোলিক পরিসরকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনই কোনও নির্দিষ্ট রোগের বিস্তারের একমাত্র কারণ নয়। নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত নিকাশি ব্যবস্থা, মানুষের চলাচল, স্বাস্থ্য পরিষেবার доступতা এবং মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতার মতো বিষয়ও রোগ সংক্রমণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই প্রতিরোধের জন্য শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তনের দিকে নজর রাখলেই হবে না, স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ
ডেঙ্গুর বৈশ্বিক বিস্তার ইতিমধ্যেই বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ১৪.৬ মিলিয়নেরও বেশি ডেঙ্গু আক্রান্তের ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছিল, যা এক বছরে নথিভুক্ত সর্বোচ্চ সংখ্যা। একশোরও বেশি দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রোগবাহী মশার বিস্তারের সম্ভাব্য পরিবর্তন স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ।
চিকুনগুনিয়াও একই ধরনের মশাবাহিত রোগ, যার বিস্তারের সঙ্গে Aedes প্রজাতির মশার উপস্থিতি জড়িত। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এই মশার বিস্তার ও রোগ সংক্রমণের পরিবর্তন নিয়ে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও উষ্ণতা ও পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে মশাবাহিত রোগের ভৌগোলিক পরিসর এবং সংক্রমণের সময়কাল বদলের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ জরুরি?
মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি কমাতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের জন্য নিয়মিত মশা নজরদারি এবং প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ি, রাস্তা ও আশপাশের এলাকায় জমে থাকা জল পরিষ্কার করা, নিকাশি ব্যবস্থা উন্নত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালনা করা যেতে পারে। WHO ভেক্টর-বাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিয়েছে।
একই সঙ্গে দ্রুত রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। জ্বর বা সংশ্লিষ্ট উপসর্গ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসার আওতায় আনা গেলে গুরুতর পরিস্থিতি এড়ানো সহজ হতে পারে। ২০২৫ সালে WHO ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ও ইয়েলো ফিভারের মতো arboviral disease-এর ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রথমবারের মতো সমন্বিত বৈশ্বিক নির্দেশিকাও প্রকাশ করেছে।
এশিয়া ও আফ্রিকার মতো অঞ্চলে, যেখানে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি ইতিমধ্যেই বেশি, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। সচেতনতা, মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগের নিয়মিত নজরদারি এবং দ্রুত চিকিৎসা—এই চারটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিলেই পরিবর্তিত জলবায়ুর মধ্যে ক্রান্তীয় রোগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।