তারাপীঠে হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ, ফায়ার অডিটে ৪০০ হোটেল

তারাপীঠে হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ, ফায়ার অডিটে ৪০০ হোটেল

তারাপীঠের হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, প্রাণ হারালেন ৯ পুণ্যার্থী

বীরভূমের তারাপীঠে ভয়াবহ হোটেল অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একাধিক প্রাণহানির পর পর্যটনকেন্দ্রের হোটেলগুলির অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। গত ১৭ আগস্ট ভোররাতে চারতলা ‘হোটেল নিউ বিদেশিনী’তে আগুন লাগে। ঘটনায় শেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৯ জন পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর তারাপীঠের হোটেলগুলিতে অগ্নি-নিরাপত্তা পরিকাঠামো খতিয়ে দেখতে বড়সড় অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।

প্রাথমিক তদন্তে সামনে আসা তথ্য অনুযায়ী, হোটেলের গ্রাউন্ড ফ্লোরে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই আগুন ও ধোঁয়া ভবনের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় হোটেলে থাকা পর্যটক ও পুণ্যার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে যায়। অভিযোগ, ভবনের পেছনের জরুরি বহির্গমন পথ বন্ধ থাকায় অনেকে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেননি। ফলে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর হোটেলটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের বেরিয়ে যাওয়ার পরিকাঠামো নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। আগুন লাগার পর নিরাপদে ভবন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জরুরি বহির্গমন পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, অভিযোগ অনুযায়ী সেই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল না। এই কারণেই হোটেলের অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলা হয়েছিল কি না, তা এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গাফিলতির অভিযোগে হোটেলের মালিক এবং তাঁর ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসনের তদন্তে অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ, নিরাপত্তা বিধিতে কোনও গাফিলতি ছিল কি না এবং জরুরি বহির্গমন পথ কেন বন্ধ ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

  • ১৭ আগস্ট ভোররাতে তারাপীঠের চারতলা হোটেল নিউ বিদেশিনী-তে আগুন লাগে।
  • ঘটনায় শেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ৯ জন পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছে।
  • প্রাথমিকভাবে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাতের অভিযোগ সামনে এসেছে।
  • জরুরি বহির্গমন গেট বন্ধ থাকায় পর্যটকদের আটকে পড়ার অভিযোগ উঠেছে।
  • গাফিলতির অভিযোগে হোটেলের মালিক ও তাঁর ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
  • ঘটনার পর প্রথম দফায় ১৫টি হোটেল সিল করেছে প্রশাসন।

তারাপীঠে ১৫টি হোটেল সিল, শুরু কঠোর নিরাপত্তা অভিযান

এই ভয়াবহ ঘটনার পর বীরভূম জেলা প্রশাসন তারাপীঠের হোটেলগুলিতে অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে। প্রথম দফার অভিযানে ১৫টি হোটেল সিল করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। প্রশাসনের এই পদক্ষেপের ফলে পর্যটনকেন্দ্রের অন্যান্য হোটেলগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তারাপীঠে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থী ও পর্যটক আসেন। বিশেষ তিথি ও উৎসবের সময় সেই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। ফলে আবাসন ব্যবস্থার নিরাপত্তা শুধু ব্যবসায়িক বিষয় নয়, পর্যটকদের জীবনরক্ষার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর প্রতিটি হোটেলে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি সিঁড়ি, বহির্গমন পথ এবং অন্যান্য সুরক্ষা পরিকাঠামো যথাযথ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রায় ৪০০ হোটেলে ফায়ার অডিটের পরিকল্পনা

প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে তারাপীঠের প্রায় ৪০০টি হোটেলের ফায়ার অডিট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই কাজের জন্য পাঁচটি যৌথ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগ, দমকল এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার প্রতিনিধিরা যৌথভাবে হোটেলগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করবেন।

ফায়ার অডিটে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক পরিকাঠামোর নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন পথ, সিঁড়ি এবং ভবন থেকে দ্রুত ও নিরাপদে মানুষ বের করার ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেসব বিষয় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হতে পারে। নিয়ম না মানলে সংশ্লিষ্ট হোটেলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

পর্যটক নিরাপত্তায় জোর

তারাপীঠের এই অগ্নিকাণ্ড ফের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, হোটেল ও অন্যান্য জনবহুল ভবনে অগ্নি-নিরাপত্তা বিধি কার্যকরভাবে মেনে চলা কতটা জরুরি। বিশেষ করে বহু পর্যটকের অবস্থান করা বহুতল ভবনে আগুন লাগলে দ্রুত উদ্ধার এবং নিরাপদ বহির্গমন ব্যবস্থাই প্রাণহানি কমানোর অন্যতম প্রধান উপায়।

৯ জনের মৃত্যুর এই মর্মান্তিক ঘটনার পর প্রশাসনের শুরু করা ব্যাপক ফায়ার অডিট অভিযান এখন তারাপীঠের হোটেলগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আনে, সেদিকেই নজর রয়েছে। তদন্তের পাশাপাশি নিরাপত্তা বিধি কার্যকর করা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তাও এই ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে।