প্রাইভেট বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘিরে চাপে ইনফান্তিনো, ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে অনাস্থার সম্ভাবনা
ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব ঘিরে ফিফায় বাড়ছে চাপ
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা FIFA-র সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট। বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক স্বত্ব থেকে ভবিষ্যৎ আয়কে কাজে লাগিয়ে একটি নতুন বাণিজ্যিক সংস্থা গঠনের পরিকল্পনা এবং সেই সংস্থায় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার প্রস্তাব ঘিরে একাধিক আঞ্চলিক ফুটবল সংস্থার সঙ্গে ফিফা সভাপতির সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হলেও তার প্রভাব এখনও কাটেনি।
ফিফার FIFA Forward Enterprise (FFE) নামে প্রস্তাবিত উদ্যোগটির সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে এসেছিল। পরিকল্পনাটির লক্ষ্য ছিল ফিফার বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে একটি পৃথক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালনা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক অধিকার থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। কিন্তু ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল সংস্থাগুলি অভিযোগ তোলে যে, এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের যথেষ্টভাবে পরামর্শ করা হয়নি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে এখনও কোনও অনাস্থা ভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে UEFA, AFC এবং CONCACAF-এর মতো আঞ্চলিক ফুটবল শক্তিগুলি তাঁকে সরাতে এমন ভোটের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। ফলে বিষয়টি এখন জল্পনার পর্যায় পেরিয়ে ফিফার প্রশাসনিক সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
- FIFA Forward Enterprise পরিকল্পনায় বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
- প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক উদ্যোগটির সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার বলে রিপোর্টে উঠে আসে।
- UEFA, AFC এবং CONCACAF ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
- এই আঞ্চলিক সংস্থাগুলি অনাস্থা ভোটের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে।
- ইনফান্তিনো ২০২৭ সালের ফিফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফের প্রার্থী হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
কেন বিতর্কের কেন্দ্রে বেসরকারি বিনিয়োগ?
ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক উদ্যোগটি মূলত ফিফার ভবিষ্যৎ আয় এবং প্রতিযোগিতাগুলির বাণিজ্যিক অধিকারকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগানোর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে সমালোচকদের প্রধান আপত্তি ছিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে। UEFA, AFC এবং CONCACAF-এর পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে, আঞ্চলিক সংস্থাগুলির সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা ছাড়াই এত গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে এগোনো হয়েছিল।
ইউরোপের ক্লাবগুলির প্রতিনিধিত্বকারী European Football Clubs বা EFC-ও এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে। সংগঠনটি ভবিষ্যতের ক্লাব বিশ্বকাপগুলির বাণিজ্যিক ও পরিচালনাগত বিষয়ে ফিফার সঙ্গে আরও স্পষ্ট যৌথ কাঠামোর দাবি তোলে। এমনকি পরিকল্পনা প্রত্যাহার না হলে ভবিষ্যৎ ক্লাব বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
অনাস্থা ভোট হলে কী হতে পারে?
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, মোট ২১১ সদস্য দেশের অন্তত ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৪৩টি সদস্য দেশ লিখিতভাবে অনুরোধ করলে একটি Extraordinary Congress ডাকার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। সেই কংগ্রেসে অনাস্থা ভোটের বিষয়টি উঠতে পারে। তবে ফিফার ১২২ বছরের ইতিহাসে এখনও কোনও প্রেসিডেন্টকে আনুষ্ঠানিক অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে সরানো হয়নি।
বর্তমানে UEFA, AFC এবং CONCACAF-এর মধ্যে এই সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তবে ইনফান্তিনোর পক্ষে এখনও উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে, বিশেষ করে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন CAF-এর সমর্থন তাঁর অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। তাই অনাস্থা ভোটের আলোচনা শুরু হলেও তাঁর পদ হারানো নিশ্চিত—এমন দাবি করার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি।
২০২৭ নির্বাচন সামনে রেখে বাড়ছে রাজনৈতিক লড়াই
এই সংকটের সময়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ ইনফান্তিনো ইতিমধ্যেই ২০২৭ সালের ফিফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফের লড়াই করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। মে মাসে ফিফা কংগ্রেসে তিনি পুনর্নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেছিলেন। আগামী মার্চে নির্ধারিত নির্বাচনের আগে তাঁর নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হতে পারে।
অন্যদিকে, FFE পরিকল্পনা প্রত্যাহারের পরও বিতর্ক থামেনি। ফিফার শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার পদত্যাগ বা অপসারণ এবং আঞ্চলিক ফুটবল সংস্থাগুলির প্রকাশ্য বিরোধিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের প্রতি সদস্য দেশগুলির সমর্থন কতটা অটুট থাকে, সেটিই বিশ্ব ফুটবল প্রশাসনের অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনা আপাতত প্রত্যাহার হলেও তা ফিফার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন কমাতে পারেনি। অনাস্থা ভোট এখনও সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে, কিন্তু UEFA, AFC এবং CONCACAF-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার অবস্থান ইনফান্তিনোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ২০২৭ সালের নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, এই বিরোধ বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।