হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা তীব্র, জাহাজ চলাচল নিয়ে বাড়ছে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা তীব্র, জাহাজ চলাচল নিয়ে বাড়ছে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালীতে ফের তীব্র উত্তেজনা

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘিরে একাধিক হামলা ও পাল্টা হামলার দাবি সামনে আসায় আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থাগুলি এবং জ্বালানি বাজার পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই তেলের বাজারে দেখা যাচ্ছে এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের উপরে উঠে গিয়েছে।

হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল কমেছে

সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলের তথ্য পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। বুধবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে মাত্র সাতটি জাহাজ যাতায়াত করেছে বলে প্রাথমিক শিপ-ট্র্যাকিং তথ্য জানিয়েছে। এর আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১২টি এবং গত ১০ দিনের গড় ছিল দিনে প্রায় ১৪টি জাহাজ। বুধবার সাতটি জাহাজের মধ্যে চারটি প্রণালী পেরিয়ে বেরিয়েছে এবং তিনটি প্রবেশ করেছে। তবে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা জাহাজ এই হিসাবের বাইরে থাকতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বুধবার হরমুজ প্রণালী থেকে কোনও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা LNG বহনকারী ট্যাঙ্কার বের হতে দেখা যায়নি। চারটি বেরিয়ে যাওয়া জাহাজের মধ্যে একটি ছিল বড় অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কার, যেটি প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল তেল বহন করছিল।

১০টি জাহাজে হামলার দাবি

ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা IRGC দাবি করেছে, সম্প্রতি হরমুজ প্রণালীর কাছে তারা ১০টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, এর মধ্যে দুটি মার্কিন জাহাজ এবং আটটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ছিল। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের কোনও জাহাজ ওই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং হামলার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে হামলার সম্পূর্ণ বিবরণ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে অন্তত একজন নাবিকের মৃত্যুর এবং আরও একজনের নিখোঁজ হওয়ার খবর সামনে এসেছে। হরমুজের আশপাশে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে তাই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ঝুঁকি বাড়লে জাহাজ সংস্থাগুলির পরিচালন খরচ এবং বিমার খরচও বাড়তে পারে।

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ?

পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ পথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে এই জলপথের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু উপসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কাতেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের উপরে ওঠার অন্যতম কারণ হিসেবে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাকে দেখা হচ্ছে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।

শুধু তেল নয়, LNG সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব শুধু অপরিশোধিত তেল পরিবহণের জন্য নয়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা LNG পরিবহণের ক্ষেত্রেও এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে তেল ও গ্যাস—দুই বাজারেই সরবরাহের উপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বুধবার কোনও LNG ট্যাঙ্কার প্রণালী দিয়ে বেরিয়ে না আসার তথ্য সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে।

শিপিং সংস্থাগুলির সামনে বাড়ছে ঝুঁকি

হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলির জন্য নিরাপত্তা এখন অন্যতম বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। সংঘাতের কারণে কোনও জাহাজকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলে বা বিকল্প পথে যেতে হলে পরিবহণের সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধঝুঁকির বিমা এবং জাহাজ পরিচালনার অতিরিক্ত খরচও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হরমুজে জাহাজ চলাচল ইতিমধ্যেই গত কয়েক দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ থাকা জাহাজের তথ্য সবসময় ধরা পড়ে না। তাই প্রকৃত জাহাজ চলাচলের সংখ্যা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উৎসের তথ্য মিলিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বিশ্ববাজারে নজর হরমুজের দিকে

হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্য বাজারের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়। সংঘাত আরও বাড়লে জাহাজ চলাচল আরও কমে যেতে পারে এবং তার প্রভাব তেল ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক দামে পড়তে পারে। অন্যদিকে পরিস্থিতি শান্ত হলে সরবরাহ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই কারণে আগামী দিনগুলিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপথের দিকে বিশেষ নজর থাকবে। পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে তেলের দাম, পরিবহণ ব্যয় এবং জ্বালানি সরবরাহের হিসাবও বদলে যেতে পারে।