হরমুজ প্রণালীকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ বললেন ট্রাম্প, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত দাবি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখানোর ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে প্রণালীটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। পরে ১৮ আগস্ট তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন, যেখানে হরমুজ প্রণালীকে ‘New U.S. Territory’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা তীব্র। ১৩ আগস্ট ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের অবস্থান জোরালো করে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, জলপথটির ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্পও ওই অঞ্চলে মার্কিন নিয়ন্ত্রণের দাবি করেন।
কেন হরমুজ প্রণালী এত গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। প্রণালীর সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল এবং এর জলসীমা ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমার মধ্যে পড়ে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্বও অত্যন্ত বেশি। উপসাগরীয় দেশগুলির তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে হরমুজ একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজার, জ্বালানি মূল্য এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ট্যাঙ্কার চলাচল কমে যাওয়ায় পরিবহন খরচ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন
ট্রাম্পের দাবিকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি একতরফাভাবে হরমুজ প্রণালীকে নিজের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করতে পারে? ভৌগোলিক ও সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী বিষয়টি এত সরল নয়। গবেষণা ও আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ক বিশ্লেষণে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালীর জলসীমা ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এটিকে সরাসরি মার্কিন সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করার কোনো স্বাভাবিক ভৌগোলিক ভিত্তি নেই।
এখানে সার্বভৌমত্ব এবং নৌ চলাচলের অধিকার—দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন হরমুজের মতো আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে বিশেষ বিধান নির্ধারণ করে। ফলে কোনো দেশের সামরিক উপস্থিতি বা কোনো সময়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা মানেই সেই জলপথের ওপর ওই দেশের সার্বভৌম মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়।
- হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ জলপথ।
- এর সরু অংশের প্রস্থ প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল।
- প্রণালীটি বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- ট্রাম্প ১৮ আগস্ট প্রকাশিত একটি মানচিত্রে এটিকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
- ইরানও প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় নতুন মাত্রা
হরমুজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শুধু আইনি বিতর্কেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক উত্তেজনাও জড়িয়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইরান ও ওমান নতুন নৌপথের স্থানাঙ্ক নিয়েও সমঝোতায় পৌঁছেছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ‘মার্কিন ভূখণ্ড’ সংক্রান্ত বক্তব্য কূটনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল কতটা বজায় থাকবে, সেটিও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আপাতত এই জলপথকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি দাবি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।