ডলারের তুলনায় আরও দুর্বল টাকা, ৯৫.৩০-এ নামল ভারতীয় রুপি
ডলারের তুলনায় আরও দুর্বল ভারতীয় রুপি
ডলারের তুলনায় আরও দুর্বল হল ভারতীয় রুপি। বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর লেনদেনে এক পর্যায়ে প্রতি ডলারের দাম ৯৫.৩০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ভারতীয় মুদ্রার উপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। আগের দিন রুপি ৯৫.১০৫০-এ লেনদেন শেষ করেছিল। বৃহস্পতিবারের শুরুতেই রুপির দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং প্রতি ডলারের দাম ৯৫.২৯-এর কাছাকাছি পৌঁছয়।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের উপরে থাকা রুপির উপর চাপ বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। ভারত তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের ডলারের চাহিদা বাড়ে এবং তার প্রভাব পড়তে পারে টাকার বিনিময় হারেও।
তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের উপরে রয়েছে। সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বেড়েছে। এই পরিস্থিতি ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তেলের দাম বেশি থাকলে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বেশি ডলার খরচ করতে হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চস্তরে থাকলে রুপির উপর চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানি খরচ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা এবং বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহও মুদ্রাবাজারের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নজর
রুপির পতন নিয়ন্ত্রণে রাখতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বা আরবিআই বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে হস্তক্ষেপ করছে বলে বাজার সূত্রে জানা গিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মাধ্যমে ডলার বিক্রি করে রুপির উপর চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তবে তেলের দাম এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে রুপির দুর্বলতা পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠছে।
এর আগে রুপির পতন সামলাতে আরবিআইয়ের হস্তক্ষেপের প্রভাব দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি হয়েছে। বাজারে এখন নজর রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার দিকে।
ভারতীয় অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে
রুপির মূল্য কমলে আমদানি করা পণ্য ও কাঁচামালের খরচ বাড়তে পারে। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল, শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামাল এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচের চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তেলের দামও একই সময়ে বাড়তে থাকলে এই চাপ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে রুপির দুর্বলতা রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা তৈরি করতে পারে। ডলারে আয় করা সংস্থাগুলি একই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এনে তুলনামূলকভাবে বেশি রুপি পেতে পারে। তবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব নির্ভর করবে তেলের দাম, আমদানি-রপ্তানি, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিস্থিতির উপর।
শেয়ারবাজারেও সতর্কতা
রুপির দুর্বলতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তেলের দাম বৃদ্ধি ভারতীয় শেয়ারবাজারেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বুধবার সেনসেক্স ৮১৩.৩৫ পয়েন্ট পড়ে ৭৪,৭৬৪.২৩-এ এবং নিফটি ২০৩.৬০ পয়েন্ট কমে ২৩,৪৩১.৫০-এ বন্ধ হয়েছিল। বৃহস্পতিবারের লেনদেনেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা দেখা যাচ্ছে।
তেলের দাম এবং মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণেও তার প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানি নির্ভর সংস্থাগুলির খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট শেয়ারে চাপ পড়তে পারে। তবে তেলের দাম বৃদ্ধিতে কিছু উৎপাদক সংস্থা তুলনামূলকভাবে সুবিধাও পেতে পারে।
আগামী দিনে রুপির দিকে নজর
এই মুহূর্তে রুপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক তেলের দাম, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ এবং ডলারের বৈশ্বিক অবস্থান। বুধবার রুপি ৯৫.১০৫০-এ বন্ধ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার ৯৫.৩০-এর কাছাকাছি পৌঁছনো বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলে এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে চাপ কমলে রুপিও কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। অন্যদিকে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের উপরে থাকলে ভারতীয় মুদ্রার উপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আগামী কয়েকটি সেশনে রুপির বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজার—দুই দিকেই বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে।