ডিভোর্সের পর সন্তানের দায়িত্ব কার? মা নাকি বাবা—আইন কাকে প্রাধান্য দেয়?

ডিভোর্সের পর সন্তানের দায়িত্ব কার? মা নাকি বাবা—আইন কাকে প্রাধান্য দেয়?

ডিভোর্সের পর সন্তানের কাস্টডি বা দায়িত্ব কার?

বিবাহবিচ্ছেদের মামলার সবচেয়ে আবেগঘন এবং জটিল অধ্যায় হলো সন্তানের দায়িত্ব বা 'Child Custody' নির্ধারণ। ডিভোর্সের পর সন্তান মায়ের কাছে থাকবে নাকি বাবার কাছে, এ নিয়ে প্রায়শই তীব্র আইনি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ভারতীয় আইনে গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট (Guardians and Wards Act, 1890) এবং হিন্দু সংখ্যালঘু ও অভিভাবকত্ব আইন (Hindu Minority and Guardianship Act, 1956)-এর অধীনে সন্তানের হেফাজত বা অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত বিধান রয়েছে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা রয়েছে যে ডিভোর্স হলে আদালত সবসময় মাকেই সন্তানের দায়িত্ব দেন। তবে আইনি বাস্তবতা হলো, আদালত মা বা বাবা কোনো পক্ষকে অন্ধভাবে প্রাধান্য না দিয়ে একটি প্রধান বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন—তা হলো 'সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণ' (Welfare of the Child)।

আইন অনুযায়ী মা ও বাবার কাস্টডির নিয়মাবলী:

  • ৫ বছর পর্যন্ত শিশুর ক্ষেত্রে মা প্রাধান্য: আইনে বলা হয়েছে, সন্তানের বয়স ৫ বছর পর্যন্ত হলে সাধারণত মাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এই বয়সে শিশুর জন্য মায়ের স্নেহ ও শারীরিক যত্ন সবচেয়ে জরুরি মনে করা হয়।
  • বাবার কাস্টডির অধিকার: সন্তান ৫ বছরের বড় হলে বাবাও পূর্ণ কাস্টডির জন্য জোর দাবি জানাতে পারেন। আইন অনুযায়ী বাবাকে প্রাকৃতিক অভিভাবক (Natural Guardian) হিসেবে গণ্য করা হলেও শুধু আয়ের ওপর ভিত্তি করে কাস্টডি চূড়ান্ত হয় না।
  • সন্তানের নিজস্ব মতামত: শিশুর বয়স যদি ৯ থেকে ১২ বছরের বেশি হয় এবং সে নিজের ভালো-মন্দ বোঝার মতো পরিপক্ক হয়, তবে আদালত গোপনে শিশুটির ইচ্ছে জেনে সিদ্ধান্ত নেন সে কার কাছে থাকতে চায়।
  • আর্থিক সামর্থ্যই শেষ কথা নয়: কেবল বাবার আয় বেশি বলেই যে তিনি সন্তানের কাস্টডি পাবেন এমন নয়। মায়ের নিজস্ব আয় না থাকলেও বাবা যদি সন্তানের যাবতীয় খরচ মেটাতে সক্ষম হন, তবে আদালত মাকেই কাস্টডি দিতে পারেন।
  • অযোগ্যতার ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র: মা বা বাবার মধ্যে কেউ যদি গুরুতর মানসিকভাবে অসুস্থ হন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, চরম অবহেলা করেন কিংবা শিশুর সুরক্ষার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হন, তবে অপর পক্ষকে কাস্টডি দেওয়া হয়।

চাইল্ড কাস্টডির প্রকারভেদ ও ভিজিটিং রাইটস

আদালত পরিস্থিতি বিবেচনা করে কয়েক ধরণের কাস্টডি মঞ্জুর করতে পারেন। প্রথমত, 'Physical Custody' যেখানে সন্তান একজনের কাছে স্থায়ীভাবে থাকে। দ্বিতীয়ত, 'Joint Custody' যেখানে সন্তান একজনের কাছে থাকলেও লালন-পালন ও পড়াশোনার প্রধান সিদ্ধান্ত দুজন মিলেই নেন। আর তৃতীয়ত, 'Legal Custody' যেখানে আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সংরক্ষিত থাকে।

যে অভিভাবক কাস্টডি পান না, তিনি কিন্তু সন্তান থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হন না। আদালত অপর পক্ষকে নিয়মিত সাক্ষাৎ করার সুযোগ (Visiting Rights), সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সাথে রাখা বা ফোনে কথা বলার আইনি অধিকার দেন। মূলত, সন্তানের শারীরিক, মানসিক ও শিক্ষাগত বিকাশ কার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ ও সুনিশ্চিত হবে—সেটিই মা বা বাবার আইনি অধিকার নির্ধারণের মূল ভিত্তি।