ডিভোর্সের পর সন্তানের ভরণপোষণ: পড়াশোনা ও খরচের আইনি দায় কার? জানুন নিয়ম

ডিভোর্সের পর সন্তানের ভরণপোষণ: পড়াশোনা ও খরচের আইনি দায় কার? জানুন নিয়ম

ডিভোর্সের পর সন্তানের ভরণপোষণ বা Child Maintenance কী?

বিবাহবিচ্ছেদের পর স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটলেও সন্তানদের প্রতি মা-বাবার আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব কিন্তু শেষ হয়ে যায় না। ডিভোর্সের ক্ষেত্রে সন্তানের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং বিশেষ করে শিক্ষা সংক্রান্ত খরচ কে বহন করবে—তা নিয়ে প্রায়শই জটিলতা দেখা দেয়। ভারতীয় আইনে অভিভাবকত্ব বা কাস্টডি (Custody) যার কাছেই থাক না কেন, সন্তানের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সাধ্যমতো ভরণপোষণ (Child Maintenance) পাওয়া শিশুর মৌলিক আইনি অধিকার।

ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড (CrPC)-এর ১২৫ ধারা (বর্তমানে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার সংশ্লিষ্ট বিধান) এবং সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী সন্তানের ভরণপোষণের সুস্পষ্ট নিয়মাবলী রয়েছে।

সন্তানের খরচের ক্ষেত্রে আইনি নিয়মাবলী:

  • বাবার প্রধান আইনি দায়: ভারতীয় আইনি কাঠামোর সাধারণ নীতি অনুযায়ী, সন্তানের কাস্টডি যদি মায়ের কাছেও থাকে, তবুও সন্তানের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার সমস্ত প্রয়োজনীয় খরচ বহন করার প্রাথমিক আইনি দায় বাবার ওপর বর্তায়।
  • শিক্ষার যাবতীয় খরচ: সন্তানের স্কুলের ফি, টিউটর, বই-খাতা, ইউনিফর্ম থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার (Higher Education) সমস্ত আইনি ও বাস্তব সম্মত খরচ যোগানোর দায়িত্ব বাবাকে নিতে হয়। কেবল প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াই পড়াশোনার খরচ বন্ধের ভিত্তি হতে পারে না।
  • মায়ের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ: মা যদি চাকরিজীবী হন এবং নিজের স্বাধীন উপার্জন থাকে, তবে আদালত পরিস্থিতি বিবেচনা করে সন্তান লালন-পালনের খরচে মা ও বাবা উভয়ের আয়ের অনুপাত অনুযায়ী আনুপাতিক ভাগ (Proportionate Division) নির্ধারণ করতে পারেন।
  • মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম: পুত্রসন্তানের ক্ষেত্রে সাধারণত ১৮ বছর (বা পড়াশোনা শেষ হওয়া) পর্যন্ত ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক হলেও, কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে বিয়ের আগে পর্যন্ত বা তিনি নিজে স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত যাবতীয় খরচ বহন করা বাবার আইনি দায়িত্ব।
  • বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সন্তান: সন্তান যদি শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম হন, তবে বয়স নির্বিশেষে আজীবন তাঁর ভরণপোষণ দিতে বাবা-মা বাধ্য থাকেন।

সন্তানের খরচ নির্ধারণে আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ডিভোর্সের ফলে সন্তান যেন কোনোভাবেই আর্থিক টানাটানি বা সামাজিক মান অবনমনের শিকার না হয়, আদালত তা সুনিশ্চিত করেন। মা-বাবার সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা বিবেচনা করেই সন্তানের জন্য মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা বা এককালীন নির্দিষ্ট ফান্ড গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

যদি কোনো বাবা আদালতের আদেশ সত্ত্বেও সন্তানের শিক্ষা বা জীবিকার খরচ দিতে অস্বীকৃতি জানান বা বকেয়া রাখেন, তবে আদালত তাঁর বেতন থেকে সরাসরি টাকা কেটে নেওয়া বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার কঠোর নির্দেশ জারি করতে পারেন। পরিশেষে, ডিভোর্সের সমঝোতাপত্র (Settlement) বানানোর সময় সন্তানের বর্তমান ও ভবিষ্যতের পড়াশোনার খরচ স্পষ্টভাবে চুক্তিবদ্ধ করে নেওয়া উভয় পক্ষের জন্যই শ্রেয়।