পারিবারিক ঋণ এবং যৌথ দায়বদ্ধতা: পরিবারের একজন ঋণ নিলে আইনি দায় কি সবার ওপর বর্তায়?

পারিবারিক ঋণ এবং যৌথ দায়বদ্ধতা: পরিবারের একজন ঋণ নিলে আইনি দায় কি সবার ওপর বর্তায়?

পারিবারিক ঋণ এবং যৌথ দায়বদ্ধতার আইনি বাস্তবতা কী?

পরিবারের কোনো সদস্য (তা স্বামী, স্ত্রী, পিতা বা অন্য কোনো স্বজন হোন না কেন) যদি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে লোন বা ঋণ নেন, তবে সেই ঋণ পরিশোধের দায় কি পুরো পরিবারের ওপর বর্তায়? সমাজে এই বিষয়ে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন পরিবারের প্রধান ঋণ নিলে সবাইকে তা শোধ করতে হয়, আবার অনেকেই মনে করেন যার ঋণ সেই একাই দায়ী।

ভারতীয় আইন ও চুক্তি আইন (Indian Contract Act, 1872) অনুযায়ী, ঋণের ধরন এবং চুক্তির শর্তের ওপর ভিত্তি করে পারিবারিক ঋণের দায় নির্ধারিত হয়।

পরিবারের ঋণের ক্ষেত্রে আইনি দায়বদ্ধতার প্রধান নিয়মাবলী:

  • ব্যক্তিগত ঋণের ক্ষেত্রে একক দায় (Individual Debt): কোনো ব্যক্তি নিজের নামে ব্যক্তিগত ঋণ (Personal Loan), ক্রেডিট কার্ডের লোন বা ব্যবসার লোন নিলে তার আইনি দায় সম্পূর্ণভাবে কেবল সেই ঋণগ্রহীতার ওপরই বর্তায়। তাঁর স্ত্রী, সন্তান বা বাবা-মা আইনগতভাবে সেই ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য নন।
  • যৌথ ঋণ বা কো-অ্যাপ্লিকেন্ট (Joint Loan / Co-Applicant): ঋণ নেওয়ার সময় স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য যদি কো-অ্যাপ্লিকেন্ট (Co-applicant) বা গ্যারান্টার (Guarantor) হিসেবে যৌথভাবে স্বাক্ষর করেন, তবেই সেই ঋণের যৌথ দায়বদ্ধতা (Joint Liability) তৈরি হয়। প্রধান ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক কো-অ্যাপ্লিকেন্ট বা গ্যারান্টারের কাছ থেকে টাকা আদায় করার আইনি অধিকার রাখে।
  • পৈতৃক সম্পত্তির দায় ও হিন্দু উত্তরাধিকার আইন: হিন্দু আইন অনুযায়ী, কর্তা (Karta) বা পরিবারের প্রধান যদি পরিবারের সাধারণ কল্যাণে বা প্রয়োজনে (যেমন—পারিবারিক ব্যবসা বা চিকিৎসার খরচ) কোনো ঋণ নেন, তবে সেই ঋণের দায় পৈতৃক সম্পত্তির ওপর বর্তাতে পারে। তবে বেআইনি কাজ, জুয়া খেলা বা ব্যক্তিগত বিলাসের জন্য নেওয়া ঋণের দায় পরিবারের ওপর বর্তায় না।
  • স্বামীর ঋণ কি স্ত্রী শোধ করতে বাধ্য? স্ত্রী যদি স্বামীর নেওয়া কোনো ঋণের গ্যারান্টার না হন, তবে স্বামীর মৃত্যুর পর বা ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংক আইনগতভাবে স্ত্রীর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট বা সম্পত্তি থেকে সেই ঋণ আদায় করতে পারে না।
  • উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি ও ঋণ: ঋণগ্রহীতা ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা যদি তাঁর সম্পত্তি (Estate) বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ গ্রহণ করেন, তবে সেই সম্পত্তির প্রাপ্ত অংশের সীমার মধ্যে মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের দায় তাদের থাকে। ব্যক্তিগতভাবে নিজের সম্পদ থেকে কেউ ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য নন।

ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংকের নোটিশ ও আইনি পদক্ষেপ

কোনো ব্যক্তি ঋণ পরিশোধ না করে মারা গেলে বা খেলাপি হলে ব্যাংক সিকিউর্ড লোন (যেমন—হোম লোন বা কার লোন)-এর ক্ষেত্রে বন্ধক রাখা সম্পত্তি নিলামে তুলতে পারে। তবে আনসিকিউর্ড লোনের (Unsecured Loan) ক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যদের হেনস্তা করার বা জোরপূর্বক টাকা আদায় করার কোনো আইনি অধিকার ব্যাংক বা ঋণদানকারী সংস্থার নেই।

সংক্ষেপে, লিখিতভাবে গ্যারান্টার বা যৌথ আবেদনকারী না হলে পরিবারের কোনো সদস্য অন্য কারো ব্যক্তিগত ঋণের জন্য আইনত দায়ী থাকেন না।