মুসলিম ও হিন্দু উত্তরাধিকার আইন: ভারতে সম্পত্তি বণ্টনের সঠিক নিয়মাবলী

মুসলিম ও হিন্দু উত্তরাধিকার আইন: ভারতে সম্পত্তি বণ্টনের সঠিক নিয়মাবলী

ভারতে হিন্দু ও মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের মৌলিক রূপরেখা

ভারতে পরিবার সম্পর্কিত আইন ও সম্পত্তি বণ্টন ব্যবস্থা ব্যক্তির নিজ নিজ ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন (Personal Law) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। উইল বা ইচ্ছাপত্র না রেখে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি কীভাবে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হবে, তা স্থির করে এই আইনগুলি। হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে ১৯৫৬ সালের 'হিন্দু উত্তরাধিকার আইন' (২০০৫ সালের সংশোধনীয়সহ) প্রযোজ্য হয়। অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়াহ বা মুসলিম ব্যক্তিগত আইন অনুসারে সম্পত্তি বন্টন করা হয়।

উভয় আইনের মূল উদ্দেশ্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে সম্পদ বণ্টন করা হলেও, দুটি আইনের বন্টন প্রক্রিয়া, অংশের পরিমাণ এবং উত্তরাধিকারীদের অগ্রাধিকারের নিয়মে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনের মূল দিকসমূহ:

  • উইলবিহীন সম্পত্তি বণ্টন: মৃত ব্যক্তি উইল না করে থাকলে আইনি উত্তরাধিকারীদের (Legal Heirs) মধ্যে স্বয়ংক্ৰিয়ভাবে সম্পত্তি বণ্টিত হয়।
  • কন্যাসন্তানের অধিকার: হিন্দু আইনে ২০০৫ সালের সংশোধনী অনুযায়ী কন্যাসন্তানরা ছেলেদের মতোই সমান অধিকার পান।
  • মুসলিম আইনে নির্ধারিত অংশ: শরীয়াহ আইন অনুযায়ী ফারাইজ (Faraid) নীতিতে প্রতিটি নির্দিষ্ট আত্নীয়ের অংশ স্থির করা থাকে।
  • স্বার্জিত ও পৈতৃক সম্পত্তি: পৈতৃক ও নিজের উপার্জিত সম্পত্তির বণ্টনে হিন্দু আইনে পার্থক্যের নিয়ম রয়েছে।
  • উইলের সীমাবদ্ধতা: মুসলিম আইনে এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পত্তি উইলের মাধ্যমে অন্যদের দেওয়া যায় না।

হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম

২০০৫ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার (সংশোধনী) আইন অনুযায়ী পরিবারের কন্যাদের সমকক্ষ উত্তরাধিকারী বা 'কোপার্সনার' (Coparcener) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পিতা বা পরিবারের পৈতৃক সম্পত্তিতে পুত্রসন্তানের মতোই কন্যাসন্তানেরও সমান আইনি অধিকার রয়েছে, তা সে কন্যা বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত।

উইল না রেখে কোনো পুরুষ মারা গেলে তাঁর সম্পত্তি প্রথম শ্রেণীর উত্তরাধিকারী বা Class-I Heirs (স্ত্রী, সন্তান ও মা)-এর মধ্যে সমানভাগে বিভক্ত হয়। প্রথম শ্রেণীর উত্তরাধিকারী কেউ না থাকলে তবেই দ্বিতীয় শ্রেণীর (Class-II) আত্মীয়রা সম্পত্তি দাবি করতে পারেন।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন ও শরীয়াহ নীতি

ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তি বণ্টনের হিসাব অত্যন্ত নির্দিষ্ট। কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তাঁর দাফন-কাফনের খরচ এবং সমস্ত ঋণ পরিশোধ করার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। মুসলিম আইনে পৈতৃক ও স্বার্জিত সম্পত্তির মধ্যে আলাদা কোনো পার্থক্য নেই; উভয়ই সমানভাবে বণ্টিত হয়।

মুসলিম আইন অনুযায়ী পুরুষ ও নারী উভয়ই সম্পত্তির অংশ পান, তবে দায়িত্ব ও পারিবারিক কাঠামোর বিচারে সাধারণত নারী উত্তরাধিকারী সংশ্লিষ্ট পুরুষ উত্তরাধিকারীর অর্ধেক অংশ পেয়ে থাকেন (যেমন—পুত্র ও কন্যার ক্ষেত্রে পুত্র যা পাবেন, কন্যা তাঁর অর্ধেক পাবেন)। তাছাড়া কোনো মুসলিম ব্যক্তি তাঁর মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ (১/৩)-এর বেশি অংশ ইচ্ছাপত্র বা উইলের মাধ্যমে অন্য কাউকে হস্তান্তর করতে পারেন না, যাতে মূল আইনি উত্তরাধিকারীরা তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।

সম্পত্তি সংক্রান্ত আইনি সচেতনতা

পারিবারিক সম্পত্তিতে নিজের আইনি অধিকার রক্ষা করতে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো জটিলতা এড়াতে সঠিক কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। উইল না থাকলে সংশ্লিষ্ট আদালতে গিয়ে আইনি উত্তরাধিকার সনদ (Legal Heir Certificate) বা সাকসেশন সার্টিফিকেট (Succession Certificate)-এর জন্য আবেদন করতে হয়। প্রয়োজনে জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ বা অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পত্তি নামজারি করানো বুদ্ধিমানের কাজ।