বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কঠোর আইন ও আমাদের সামাজিক দায়িত্ব: জেনে নিন আইনি বিধান
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন ও তার গুরুত্ব
বাল্যবিয়ে একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি যা শিশু অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করে এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের ভবিষ্যৎ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাজীবন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ভারতে বাল্যবিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটিকে প্রতিরোধ করতে ২০০৬ সালে 'প্রোহিবিশন অফ চাইল্ড ম্যারেজ অ্যাক্ট' (Prohibition of Child Marriage Act, 2006) বা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, বিবাহের জন্য কনের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং বরের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর হওয়া বাধ্যতামূলক।
আইনের চোখে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় যেকোনো বিয়ে একটি গুরুতর অপরাধ। শিশু সুরক্ষা ও সুস্থ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে এই আইনটিকে অত্যন্ত কঠোর ও অ-জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ আইনের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ:
- বিয়ের ন্যূনতম বয়স: মেয়েদের ক্ষেত্রে অন্তত ১৮ বছর এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে অন্তত ২১ বছর বয়স পূরণ হওয়া আবশ্যক।
- অ-জামিনযোগ্য অপরাধ: বাল্যবিয়ে দেওয়া বা আয়োজন করা আইনের চোখে অ-জামিনযোগ্য ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
- বিয়ে বাতিল করার অধিকার: অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে হলে সাবালক হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেই বিয়ে বাতিল করার আবেদন করতে পারেন।
- তদারকি কর্মকর্তা: প্রতিটি জেলায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কর্মকর্তা (Child Marriage Prohibition Officer) নিযুক্ত থাকেন।
- সামাজিক ও সরকারি সুরক্ষা: কন্যাশিশুদের পড়াশোনা জারি রাখতে ও বাল্যবিয়ে রুখতে বিভিন্ন সামাজিক ও সরকারি প্রকল্প কার্যকর রয়েছে।
বাল্যবিয়ে আয়োজন ও সহযোগিতার আইনি শাস্তি
২০০৬ সালের বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, শুধু বিয়ের মূল আয়োজক বা অভিভাবক নন, বরং যারা এই বিয়ে সম্পাদনে সাহায্য করেন তারা সকলেই শাস্তির আওতায় আসেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো ছেলে বা মেয়ের বিয়ে দিলে অথবা বিয়ের আয়োজন করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ২ বছর পর্যন্ত কঠোর কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো কাজী, পুরোহিত, ডেকোরেটর, নিমন্ত্রিত অতিথি বা সহায়ক যদি জানেন যে বিয়েটি বাল্যবিয়ে এবং তা সত্ত্বেও তাতে সহযোগিতা করেন, তবে তারাও সমানভাবে অপরাধী বলে গণ্য হবেন। এছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক কোনো পুরুষ যদি কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বিয়ে করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধেও কঠোর সাজার বিধান রয়েছে।
আমাদের সামাজিক দায়িত্ব ও কোথায় যোগাযোগ করবেন
আইনি কড়াকড়ির পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাই বাল্যবিয়ে মুক্ত সমাজ গড়ার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি। আশেপাশে কোনো বাল্যবিয়ের আয়োজন হচ্ছে জানতে পারলে নীরব না থেকে অবিলম্বে সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত। অভিভাবক ও স্থানীয় অধিবাসীদের বাল্যবিয়ের শারীরিক, মানসিক ও আইনি বিপদ সম্পর্কে অবহিত করা প্রয়োজন।
যদি কোথাও কোনো বাল্যবিয়ে সংগঠিত হওয়ার খবর পান, তবে দ্রুত স্থানীয় পুলিশ থানা, গ্রাম পঞ্চায়েত বা ব্লক উন্নয়ন কর্মকর্তার (BDO) কার্যালয়ে খবর দিন। এছাড়া ২৪ ঘণ্টা কার্যকর জাতীয় চাইল্ডলাইন নম্বর ১০৯৮ (Childline 1098) অথবা জরুরি পরিষেবা নম্বর ১১২-এ ফোন করে পরিচয় গোপন রেখেই সরাসরি সাহায্য চাওয়া যায়। আইনি পদক্ষেপ ও সামাজিক সচেতনতার যৌথ প্রচেষ্টাতেই একটি শিশু-বান্ধব ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।