সম্পত্তির উত্তরাধিকারী: লিভ-ইন সঙ্গীর কি একে অপরের সম্পত্তির ওপর কোনো আইনি অধিকার থাকে?

সম্পত্তির উত্তরাধিকারী: লিভ-ইন সঙ্গীর কি একে অপরের সম্পত্তির ওপর কোনো আইনি অধিকার থাকে?

লিভ-ইন সম্পর্ক ও সম্পত্তির আইনি কাঠামোর পটভূমি

ভারতে অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক যুগলদের জন্য 'লিভ-ইন রিলেশনশিপ' (Live-in Relationship) আইনত বৈধ হলেও বিবাহিত দম্পতির মতো সরাসরি সমস্ত পারিবারিক আইন বা আইনি স্বাধিকার তাঁদের ওপর বর্তায় না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে যখন কোনো একটি সঙ্গীর মৃত্যু ঘটে অথবা সম্পর্ক ভেঙে যায়—জীবিত সঙ্গীর কি মৃত বা অপর সঙ্গীর সম্পত্তির ওপর কোনো আইনি বা উত্তরাধিকার অধিকার থাকে? উত্তর হলো: ভারতীয় ব্যক্তিগত আইন (Personal Laws) অনুযায়ী সরাসরি কোনো আইনি অধিকার থাকে না, তবে সুনির্দিষ্ট কিছু উপায়ে বা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে আর্থিক সুরক্ষা মিলতে পারে।

বিবাহিত স্ত্রীর মতো আইনসম্মতভাবে সরাসরি "উত্তরাধিকার" (Intestate Succession) হিসেবে লিভ-ইন সঙ্গীর সম্পত্তিতে স্বয়ংক্রিয় কোনো অংশ থাকে না। ফলে সম্পর্কের স্থায়িত্ব যাই হোক না কেন, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতন হওয়া ও আইনি নিয়মাবলী জেনে রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।

লিভ-ইন সঙ্গীর সম্পত্তি অধিকার সংক্রান্ত মূল আইনি দিকসমূহ:

  • স্বয়ংক্রিয় উত্তরাধিকারের অনুপস্থিতি: লিভ-ইন সঙ্গীর মৃত্যুর পর কোনো উইল (Will) না থাকলে অন্য সঙ্গী আইনত প্রথম শ্রেণীর উত্তরাধিকারী (Class-I Heir) হিসেবে গণ্য হন না।
  • উইল বা ইচ্ছাপত্রের মাধ্যমে সম্পত্তি প্রাপ্তি: কোনো ব্যক্তি চাইলে তাঁর স্বার্জিত সম্পত্তি নিবন্ধিত উইলের মাধ্যমে লিভ-ইন সঙ্গীকে সম্পূর্ণ লিখে দিয়ে যেতে পারেন।
  • যৌথ মালিকানায় থাকা সম্পত্তি: লিভ-ইন সম্পর্কে থাকাকালীন উভয় সঙ্গীর যৌথ নামে কেনা সম্পত্তিতে নিজ নিজ বিনিয়োগের অংশের ওপর পূর্ণ অধিকার থাকে।
  • গার্হস্থ্য হিংসা আইনে খোরপোষ: সঙ্গীর মৃত্যুর পর সম্পত্তি সরাসরি না পেলেও বিচ্ছেদ বা জীবনযাত্রার খরচের জন্য আইনি পথে অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ।
  • সন্তানের আলাদা সম্পত্তি অধিকার: লিভ-ইন সঙ্গীদের জন্ম নেওয়া সন্তান কিন্তু পৈতৃক ও পিতামাতার স্বার্জিত সম্পত্তিতে পূর্ণ উত্তরাধিকার অধিকার লাভ করে।

উত্তরাধিকার আইন (Succession Laws) এবং আদালতের অবস্থান

হিন্দু উত্তরাধিকার আইন (Hindu Succession Act, 1956) বা ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন (Indian Succession Act, 1925)-এর আওতায় আইনি স্ত্রীর যে অধিকার রয়েছে, তা লিভ-ইন সঙ্গীর নেই। কোনো ব্যক্তি যদি কোনো উইল না করেই মারা যান (Intestate Death), তবে তাঁর স্বার্জিত ও পৈতৃক সম্পত্তি কেবল তাঁর আইনি প্রথম শ্রেণীর ওয়ারিশদের (যেমন—মা, স্ত্রী, সন্তান) মধ্যে বন্টিত হবে। সেখানে লিভ-ইন সঙ্গী কোনো আইনি অংশ দাবি করতে পারেন না।

তবে সুপ্রিম কোর্ট একাধিক পর্যবেক্ষণে নিশ্চিত করেছে যে, যদি দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে একত্রে থাকেন, তবে নারী সঙ্গী বিচ্ছেদের পর ভরণপোষণ বা আবাসন সুবিধা পান। কিন্তু ভরণপোষণ দাবি করার অর্থ সম্পত্তিতে স্থায়ী মালিকানা বা শেয়ার পাওয়া নয়।

সম্পত্তির ভবিষ্যৎ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার উপায়

লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সম্পত্তি নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা বা আত্মীয়দের সঙ্গে বিরোধ এড়াতে আগাম আইনি পদক্ষেপ নেওয়া বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। কোনো সঙ্গী যদি চান যে তাঁর অনুপস্থিতিতে অপর সঙ্গী আর্থিকভাবে সুরক্ষিত থাকুন, তবে তাঁকে জীবিত থাকা অবস্থায় কিছু আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত।

আইনি সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার কার্যকরী পদক্ষেপ:

  • রেজিস্ট্রিকৃত উইল (Registered Will): নিজের অর্জিত সম্পত্তি সঙ্গীর নামে উইল করে যাওয়া, যাতে পরবর্তীতে আইনি ওয়ারিশরা তা খারিজ করতে না পারেন।
  • যৌথ ক্রয় ও নামজারি (Joint Purchase): জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার সময় উভয় সঙ্গীর নাম যৌথভাবে ক্রেতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।
  • ব্যাংক ও বিনিয়োগে নমিনি (Nomination): ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মিউচুয়াল ফান্ড, ইনসিওরেন্স ও অন্যান্য বিনিয়োগে সঙ্গীকে 'নমিনি' হিসেবে যুক্ত করা।
  • স্বচ্ছ হিসাব ও নথিপত্র: যৌথ কেনাকাটা বা নির্মাণকাজে নিজের অর্থ বিনিয়োগের রসিদ ও ব্যাংকিং নথিপত্র সুরক্ষিত রাখা।

পরিশেষে, সন্তানরা পিতামাতার সম্পত্তিতে পূর্ণ আইনি অংশীদার হলেও সঙ্গী হিসেবে সরাসরি উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইনসম্মত উইলের বিকল্প নেই। কোনো আইনি সমস্যা বা বিরোধের সম্মুখীন হলে দেওয়ানি আদালত বা অভিজ্ঞ সম্পত্তি বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।