লিভ-ইন সম্পর্কে জন্ম নেওয়া সন্তানের আইনি বৈধতা ও সম্পত্তির অধিকার কতটুকু?
লিভ-ইন সম্পর্ক ও সন্তানের আইনি বৈধতা
বিবাহ ছাড়াই একসঙ্গে বসবাস বা 'লিভ-ইন রিলেশনশিপ' (Live-in Relationship) সমাজে বহুল আলোচিত হলেও, এই সম্পর্কের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানের ভবিষ্যৎ ও আইনি পরিচয় নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে। ভারতীয় আইন ও আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—কোনো প্রাপ্তবয়স্ক দম্পতির লিভ-ইন সম্পর্কের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশু সম্পূর্ণ 'বৈধ' (Legitimate)। ভারতের সমাজ বা আইন কোনো সন্তানকেই 'অবৈধ' বা জারজ হিসেবে চিহ্নিত করা সমর্থন করে না।
দীর্ঘদিন ধরে স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাসকারী দম্পতির ঘর আলো করে আসা শিশু অন্য যেকোনো সাধারণ বৈবাহিক সম্পর্কের শিশুর মতোই সমান আইনি সুরক্ষা ও সামাজিকভাবে মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রাখে।
লিভ-ইন সম্পর্কে জন্ম নেওয়া সন্তানের প্রধান মৌলিক অধিকারসমূহ:
- সম্পূর্ণ বৈধতা (Legitimacy): পিতামাতার বিবাহের আইনি নথি না থাকলেও সন্তান আইনত বৈধ হিসেবে গণ্য হয়।
- পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের পরিচয়: জন্ম সনদে পিতা ও মাতা উভয়ের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহারের পূর্ণ অধিকার।
- ভরণপোষণের অধিকার (Maintenance): ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC ১২৫ / BNSS ১৪৪) অনুযায়ী বাবা-মায়ের কাছ থেকে খোরপোষ পাওয়ার সুযোগ।
- পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার: মা-বাবার নিজস্ব অর্জিত ও সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় পৈতৃক সম্পত্তির অংশ লাভ।
- আইনি অভিভাবকত্ব (Custody): সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটলে সন্তানের কল্যাণ বিচার করে আদালতের মাধ্যমে হেফাজত নির্ধারণ।
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় ও সম্পত্তির আইনি উত্তরাধিকার
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একাধিক ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট করেছে যে, দীর্ঘমেয়াদী লিভ-ইন সম্পর্কের ফলে জন্মানো শিশু কোনোভাবেই অবৈধ নয়। হিন্দু বিবাহ আইনের (Hindu Marriage Act, 1955) ১৬ নম্বর ধারার আলোকেই এই শিশুদের উত্তরাধিকার অধিকার বিবেচিত হয়। ২০২২ সালের 'কাট্টুকান্দি পঠুম্মা বনাম কাট্টুকান্দি উন্নিরায়ান' মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পুনর্ব্যক্ত করে যে, যদি দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে একসাথে থাকেন তবে আইন সেই সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানকে সম্পূর্ণ বৈধ বলেই মেনে নেবে।
সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে, লিভ-ইন সম্পর্কের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সন্তান তার পিতামাতার স্বার্জিত (Self-acquired) সম্পত্তিতে সাধারণ সন্তানের মতোই পূর্ণ আইনি অংশের দাবিদার। আইনত পিতামাতা তাদের নিজেদের উপার্জিত সম্পত্তি সন্তানকে দিতে বাধ্য বা সন্তান তা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে।
অভিভাবকত্ব ও শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করার নিয়ম
লিভ-ইন সম্পর্ক যদি কোনো কারণে পরবর্তীতে ভেঙে যায়, তবে সন্তানের ভবিষ্যৎ বা খোরপোষ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে পিতা ও মাতা উভয়ই সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বহনে আইনত বাধ্য থাকেন। অভিভাবকত্ব (Custody) নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে আদালত কেবল মা বা বাবার দাবি নয়, বরং 'সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণ' (Welfare of the Child)-কে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
নিজের বা সন্তানের আইনি অধিকার থেকে কেউ বঞ্চিত হলে স্থানীয় ফ্যামিলি কোর্ট (Family Court) বা ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি (DLSA)-র সহায়তায় আইনি প্রতিকার এবং বিনামূল্যে সরকারি আইনজীবীর সেবা গ্রহণ করা সম্ভব।