লিভ-ইন রিলেশনশিপ কি অপরাধ? অবিবাহিত যুগলদের আইনি অধিকার নিয়ে যা বলছে দেশের আইন
লিভ-ইন রিলেশনশিপ ও ভারতীয় আইনের অবস্থান
আধুনিক সমাজব্যবস্থায় অবিবাহিত যুগলদের মধ্যে একসঙ্গে বসবাসের বা 'লিভ-ইন রিলেশনশিপ' (Live-in Relationship)-এর প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সমাজিক দ্বিধা ও তথ্যের অভাবে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে—লিভ-ইন রিলেশনশিপ কি অপরাধ? ভারতীয় আইন ও ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক ঐতিহাসিক রায় অনুযায়ী, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ স্বেচ্ছায় বিবাহ বন্ধনে না আবদ্ধ হয়েও একসাথে বসবাস করা কোনো অপরাধ নয়। ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ব্যক্তি স্বাধীনতা ও জীবন ধারণের অধিকারের (Right to Life and Personal Liberty) অংশ হিসেবে এটিকে সম্পূর্ণ বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
সমাজ বা পরিবারের দৃষ্টিতে এটি নিয়ে অনীহা থাকলেও, আইনি পরিভাষায় এটি সম্পূর্ণ বৈধ। তবে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ক্ষেত্রে অংশীদারদের সুরক্ষায় দেশের আইন সুনির্দিষ্ট আইনি অধিকার ও দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করেছে।
লিভ-ইন রিলেশনশিপ সংক্রান্ত মূল আইনি দিকসমূহ:
- প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতি: মহিলার বয়স অন্তত ১৮ এবং পুরুষের বয়স অন্তত ২১ বছর হলে স্বেচ্ছায় একসঙ্গে থাকা আইনত বৈধ।
- গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধ আইন: দীর্ঘ সময়ের লিভ-ইন সম্পর্ককে বিয়ের সমতুল্য গণ্য করে ২০০৫ সালের ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাক্টের অধীনে নারীদের সুরক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
- খোরপোষের অধিকার: সম্পর্ক ভেঙে গেলে বা বিচ্ছেদের পর ভুক্তভোগী নারী আইনি প্রক্রিয়ায় খোরপোষ (Maintenance) দাবি করতে পারেন।
- সন্তানের বৈধতা: লিভ-ইন সম্পর্কের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানকে সম্পূর্ণ বৈধ সন্তান হিসেবে গণ্য করা হয়।
- হোটেল ও আবাসন অধিকার: প্রাপ্তবয়স্ক যুগলকে পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে একসাথে থাকার জন্য রুম দিতে বা ঘর ভাড়া দিতে অস্বীকার করা বা হেনস্থা করা আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার।
লিভ-ইন সম্পর্কে নারী ও সন্তানের আইনি অধিকার
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায় অনুযায়ী, কোনো যুগল যদি দীর্ঘদিন ধরে স্বামী-স্ত্রীর মতো একই ছাদের নিচে বসবাস করেন, তবে আইন সেই সম্পর্ককে সাধারণ বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি সুরক্ষা প্রদান করে। এই জাতীয় সম্পর্কে নারী সঙ্গী পারিবারিক নির্যাতন বা প্রতারণার শিকার হলে তিনি সরাসরি পুলিশ বা আদালতে সুরক্ষা ও আর্থিক সহায়তার আবেদন জানাতে পারেন।
এছাড়া, লিভ-ইন সম্পর্কের মাধ্যমে কোনো শিশুর জন্ম হলে ভারতীয় আইনানুসারে সেই শিশু পিতৃ-মাতৃ পরিচয়ে সমস্ত আইনি সুযোগ-সুবিধা লাভ করে। পিতামাতার স্বার্জিত সম্পত্তিতে উক্ত শিশুর পূর্ণ উত্তরাধিকার অধিকার বহাল থাকে, অর্থাৎ সন্তানকে কখনোই কোনো আইনগত অযোগ্যতার মুখোমুখি হতে হয় না।
পুলিশি হয়রানি ও সামাজিক হেনস্থা এড়াতে আইনি পরামর্শ
অবিবাহিত যুগল হিসেবে একসঙ্গে বসবাস করা বা ভ্রমণ করার সময় অনেক সময় স্থানীয় মানুষ বা কিছু অসাধু ব্যক্তিদের থেকে অহেতুক হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়। তবে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা নাগরিক কেবলমাত্র বিবাহিত না হওয়ার অজুহাতে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক যুগলকে আটক, গ্রেপ্তার বা ব্ল্যাকমেইল করতে পারেন না।
কোনো প্রকার বেআইনি হেনস্থা বা হুমকির মুখে পড়লে সাথে সাথে নিজস্ব বৈধ পরিচয়পত্র (যেমন—আধার কার্ড বা ভোটার কার্ড) কাছে রাখা এবং সচেতনভাবে আইনি সাহায্য চাওয়া উচিত। অন্যায়ভাবে ভয় দেখালে নিকটস্থ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা, উইমেন হেল্পলাইন নম্বর ১৮১ বা জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের (DLSA) দ্বারস্থ হয়ে সুরক্ষা দাবি করা নাগরিকের আইনি অধিকার।