পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন: সন্তান দেখভাল না করলে মা-বাবা কীভাবে আইনি প্রতিকার পাবেন?
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন কী?
বৃদ্ধ বয়সে সন্তান যদি পিতা-মাতার যত্ন না নেয় বা আর্থিক ও মানসিকভাবে অবহেলা করে, তবে ভারতীয় আইনে প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষায় অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। প্রবীণ পিতা-মাতার অধিকার রক্ষায় ২০০৭ সালে প্রণীত হয় 'মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার অফ প্যারেন্টস অ্যান্ড সিনিয়র সিটিজেনস অ্যাক্ট' (Maintenance and Welfare of Parents and Senior Citizens Act, 2007)। এর পাশাপাশি ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১২৫ ধারা (বর্তমানে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহতির সংশ্লিষ্ট বিধান)-এর অধীনেও পিতা-মাতা সন্তানের বিরুদ্ধে খোরপোশ ও ভরণপোষণের দাবি করতে পারেন।
অনেক মা-বাবাই জানেন না যে সন্তান দেখভাল না করলে অত্যন্ত সহজে ও কম খরচে তারা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।
সন্তান দেখভাল না করলে মা-বাবার আইনি অধিকার ও প্রতিকারের উপায়:
- ভরণপোষণ ট্রাইব্যুনালে আবেদন: এই আইনের অধীনে প্রতিটি মহকুমায় (Sub-Division) একটি করে 'মেন্টেন্যান্স ট্রাইব্যুনাল' গঠন করা হয়েছে। প্রবীণ পিতা-মাতা উকিল ছাড়াই সরাসরি এই ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ বা খোরপোশের আবেদন জানাতে পারেন।
- মাসিক খোরপোশ বা ভাতার পরিমাণ: আদালত বা ট্রাইব্যুনাল সন্তানের আয় ও সামর্থ্য বিবেচনা করে পিতা-মাতাকে মাসিক সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা (বা প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত অর্থ) ভাতা হিসেবে প্রদান করার নির্দেশ দিতে পারেন।
- সম্পত্তি বা বাড়ি ফেরত নেওয়া: পিতা-মাতা যদি এই শর্তে সন্তানকে সম্পত্তি বা বাড়ি লিখে দিয়ে থাকেন যে সন্তান তাদের দেখভাল করবে, কিন্তু পরবর্তীতে সন্তান অবহেলা করে, তবে ট্রাইব্যুনাল সেই সম্পত্তির দলিল বা হস্তান্তর সম্পূর্ণ বাতিল (Null and Void) ঘোষণা করে সম্পত্তি মা-বাবাকে ফেরত দিতে পারেন।
- বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অধিকার: প্রবীণ নাগরিকের নিজস্ব মালিকানাধীন বা বসবাসকারী বাড়ি থেকে সন্তান বা তাদের পরিবার যদি নির্যাতন বা অনাদর করে, তবে পুলিশ ও ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সন্তানকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ (Eviction) করা সম্ভব।
- কারাদণ্ড ও দণ্ডবিধি: ট্রাইব্যুনালের আদেশ সত্ত্বেও সন্তান যদি নির্ধারিত সময়ে খোরপোশ না দেয় বা পিতা-মাতাকে সম্পূর্ণ ত্যাগ/পরিত্যাগ করে, তবে সন্তানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি এবং কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইনি আবেদন করার সহজ পদ্ধতি
প্রবীণ পিতা-মাতার আইনি প্রক্রিয়াকে অতি সহজ ও ব্যয়মুক্ত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বা মহকুমা শাসকের (SDO / SDM) অফিসে ট্রাইব্যুনালে আবেদন জমা দেওয়া যায়। মামলা পরিচালনার জন্য জটিল কোনো কোর্ট ফি দিতে হয় না এবং প্রবীণ নাগরিকদের সুবিধার্থে সিনিয়র সিটিজেন হেল্পলাইন বা জেলা আইনি সেবা কর্তৃপক্ষের (DLSA) বিনামূল্যে উকিলে সহায়তা পাওয়া যায়।
সংক্ষেপে, ভারতীয় আইন অনুযায়ী পিতা-মাতার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার সমস্ত দায়িত্ব বহন করা সন্তান বা আইনি ওয়্যারিশদের জন্য বাধ্যতামূলক। অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হলে মা-বাবা নিরবে সহ্য না করে এই আইনের আশ্রয় নিয়ে পূর্ণ আইনি প্রতিকার পেতে পারেন।