বিবাহিত ব্যক্তির লিভ-ইন সম্পর্ক: আইনি বৈধতা নাকি বড় অপরাধ? জানুন কঠোর নিয়ম
বিবাহিত ব্যক্তির লিভ-ইন সম্পর্ক ও আইনি প্রেক্ষাপট
দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ও অবিবাহিত নারী-পুরুষের লিভ-ইন সম্পর্ক ভারতে সম্পূর্ণ বৈধ হলেও, কোনো বিবাহিত ব্যক্তির অন্য কারো সাথে বিয়ে ছাড়া বা বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রেখে লিভ-ইন সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি জটিল আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়। নিজের আইনি স্ত্রী বা স্বামীকে বহাল রেখে অন্য কারো সাথে দম্পতি হিসেবে বসবাস করা ভারতীয় পারিবারিক আইন ও সামাজিক কাঠামোর পরিপন্থী। আদালতের একাধিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই ধরনের সম্পর্ককে সাধারণ বা বৈধ 'লিভ-ইন রিলেশনশিপ' হিসেবে গণ্য করা যায় না, বরং এটিকে একপ্রকার অনৈতিক বা অবৈধ সহবাস হিসেবে বিচার করা হয়।
বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় অন্য কারো সঙ্গে সহবাস ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সাজা না পেলেও, তা দেওয়ানি আইন ও বৈবাহিক আইনের অধীনে চরম ক্ষতিকারক আইনি পরিণতি ডেকে আনে।
বিবাহিত ব্যক্তি লিভ-ইন সম্পর্কে জড়ালে যেসব প্রধান আইনি জটিলতা তৈরি হয়:
- বৈবাহিক অধিকার ক্ষুণ্ন: আইনসম্মত বৈবাহিক সম্পর্কের চুক্তি লঙ্ঘন করা এবং বৈধ সঙ্গীর সাথে মানসিক ও বৈবাহিক বিশ্বাসভঙ্গ করা।
- বিবাহবিচ্ছেদের জোরালো ভিত্তি: বৈধ স্বামী বা স্ত্রী এই পরকীয়া সহবাসের ওপর ভিত্তি করে 'নিষ্ঠুরতা' (Cruelty) ও 'পরকীয়া' (Adultery)-র অজুহাতে অবিলম্বে আইনি বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করতে পারেন।
- খোরপোষ ও ক্ষতিপূরণ প্রদান: প্রতারিত স্ত্রী ফৌজদারি কার্যবিধি ও গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধ আইনের অধীনে আলাদাভাবে থাকার খরচ ও বড় অঙ্কের খোরপোষ দাবি করতে পারেন।
- সুরক্ষার অনুপস্থিতি: দ্বিতীয় সঙ্গীর সাথে সম্পর্ককে আদালত বিয়ের সমতুল্য (Relationship in the nature of marriage) হিসেবে গণ্য না-ও করতে পারে।
- বহুবিবাহের নিষেধাজ্ঞা: প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্স না দিয়ে দ্বিতীয় সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে বিয়ে করার চেষ্টা করলে তা 'দ্বি-বিবাহ' বা বাইগ্যামী (Bigamy) হিসেবে দণ্ডনীয় অপরাধ।
পরকীয়া (Adultery) ও বিচার ব্যবস্থার কঠোর অবস্থান
২০১৮ সালের ঐতিহাসিক রায়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা রদ করে পরকীয়াকে ফৌজদারি অপরাধ (Criminal Offense) থেকে মুক্ত করেছে, অর্থাৎ এর জন্য সরাসরি জেলে যেতে হয় না। কিন্তু আদালত এটি অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পরকীয়া বা বিবাহিত অবস্থায় অন্যের সাথে লিভ-ইন করা দেওয়ানি আইনের অধীনে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ ও মানসিক নিষ্ঠুরতা।
উচ্চ আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো বিবাহিত ব্যক্তি যদি আইনসম্মত বিবাহবিচ্ছেদ (Judicial Divorce) না পেয়ে অন্য কারো সাথে লিভ-ইন করেন, তবে সেই সঙ্গী বা সঙ্গিনী বিবাহের সাধারণ সুবিধা বা আইনি সুরক্ষার দাবিদার হবেন না।
সম্পত্তি, সন্তান ও উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রতিকার
বিবাহিত ব্যক্তির এমন লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও যদি কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তবে আইনের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সেই সন্তানকে 'অবৈধ' বলা হয় না। জন্ম নেওয়া শিশুর পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার এবং পিতা-মাতার কাছ থেকে খোরপোষ পাওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে। তবে দ্বিতীয় সঙ্গী সরাসরি কোনো পৈতৃক বা অর্জিত সম্পত্তিতে আইনি উত্তরাধিকার দাবি করতে পারেন না।
যেকোনো বিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে নতুন করে কারো সঙ্গে বসবাস করার পূর্বে প্রথম বিবাহের আইনি বিচ্ছেদ বা ডিভোর্স ডিগ্রি (Divorce Decree) অর্জন করা বাধ্যতামূলক। আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে গঠিত সম্পর্ক কেবল পারিবারিক ও সামাজিক বিবাদ সৃষ্টি করে না, বরং মারাত্মক আইনি বিপদে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট।