ডিভোর্সের পর খোরপোশ বা অ্যালিমনি: স্ত্রী কত টাকা দাবি করতে পারেন? জানুন আইনি নিয়ম

ডিভোর্সের পর খোরপোশ বা অ্যালিমনি: স্ত্রী কত টাকা দাবি করতে পারেন? জানুন আইনি নিয়ম

ডিভোর্সের পর খোরপোশ বা অ্যালিমনি কী?

বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল আইনি দিকটি হলো খোরপোশ বা অ্যালিমনি (Alimony / Maintenance)। ডিভোর্সের পর যাতে কোনো এক পক্ষ (সাধারণত আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা স্ত্রী) আর্থিক সংকটে না পড়েন এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে পারেন, তার জন্যই আইনে খোরপোশের বিধান রয়েছে। ভারতীয় আইনে মূলত দুই ধরণের খোরপোশের কথা বলা হয়েছে—মামলা চলাকালীন অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশ (Interim Maintenance) এবং বিচ্ছেদের পর স্থায়ী খোরপোশ (Permanent Alimony)।

অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে, ডিভোর্সের পর স্ত্রী ঠিক কত টাকা বা স্বামীর আয়ের কত শতাংশ খোরপোশ হিসেবে দাবি করতে পারেন? আইনে কি কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা বাঁধা আছে?

আইন অনুযায়ী খোরপোশের নির্ধারিত পরিমাণ:

  • নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই: ভারতীয় আইনে খোরপোশ হিসেবে কত টাকা দিতে হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট বা স্থির পরিমাণ নির্ধারণ করা নেই। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে মামলার পরিস্থিতি ও আদালতের বিচক্ষণতার ওপর।
  • মাসিক খোরপোশের সাধারণ হার: সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্টের বিভিন্ন রায় অনুযায়ী, মাসিক খোরপোশের ক্ষেত্রে স্বামীর নিট (Net) বা প্রকৃত আয়ের সাধারণত ২৫% (এক-চতুর্থাংশ) পর্যন্ত টাকা স্ত্রীকে দেওয়ার একটি সাধারণ মাপকাঠি বা বেঞ্চমার্ক হিসেবে ধরা হয়।
  • এককালীন অ্যালিমনি (Lump-sum Alimony): এককালীন বা স্থায়ী খোরপোশের ক্ষেত্রে সাধারণত স্বামীর মোট নেট সম্পদের (Net Worth) বা বার্ষিক আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-পঞ্চমাংশ (২০% থেকে ৩৩%) পর্যন্ত নির্ধারণ করা হতে পারে।

খোরপোশের পরিমাণ নির্ধারণে আদালত যা বিবেচনা করেন

খোরপোশের অঙ্ক বা পরিমাণ কত হবে, তা নির্ধারণ করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট 'রজনীশ বনাম নেহা' (Rajnesh v. Neha, 2020) ঐতিহাসিক মামলায় একটি স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করেছেন। এর অধীনে উভয় পক্ষকে তাদের সমস্ত আয়, সম্পত্তি ও দায়ের বিস্তারিত বিবরণী (Affidavit of Assets and Liabilities) আদালতে জমা দিতে হয়।

খোরপোশ নির্ধারণের সময় আদালত যেসব বিষয় খতিয়ে দেখেন:

১. স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি: স্বামীর মোট আয়, ব্যবসার অবস্থা, ব্যাংক ব্যালেন্স, বাড়ি-গাড়ি এবং তার ওপর নির্ভরশীল অন্য সদস্যের সংখ্যা।

২. স্ত্রীর আর্থিক অবস্থা ও কর্মসংস্থান: স্ত্রী নিজে চাকরি করেন কি না বা তার নিজস্ব কোনো আয়ের উৎস আছে কি না। তবে স্ত্রী শিক্ষিত বা কর্মক্ষম হলেও যদি তিনি বর্তমানে বেকার থাকেন, তাহলেও তিনি খোরপোশ পাওয়ার অধিকারী।

৩. বিয়ের আগের জীবনযাত্রার মান: বিবাহিত জীবনে স্ত্রী যে জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ছিলেন, বিচ্ছেদের পরও তিনি যেন একই মান বজায় রাখতে পারেন, সেটিকে আদালত গুরুত্ব দেন।

৪. সন্তানের দায়িত্ব: সন্তান যদি স্ত্রীর কাছে থাকে, তবে তার পড়াশোনা, চিকিৎসা ও সামগ্রিক লালন-পালনের খরচ আলাদাভাবে হিসাব করা হয়।

উল্লেখ্য, খোরপোশ পাওয়ার পর স্ত্রী যদি পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন (Remarriage), তবে সাধারণত সেই দিন থেকে তিনি আর সাবেক স্বামীর কাছ থেকে মাসিক খোরপোশ বা রক্ষণাবেক্ষণ খরচ পাওয়ার অধিকারী থাকেন না।