শ্বশুরবাড়িতে পুত্রবধূর আইনি অধিকার: থাকার ও ভরণপোষণের নিয়মাবলী
শ্বশুরবাড়িতে পুত্রবধূর আইনি অবস্থান ও অধিকার কী?
বিবাহের পর শ্বশুরবাড়ি বা দাম্পত্য ভিটায় (Shared Household) বসবাসকারী পুত্রবধূর আইনি অধিকার নিয়ে সমাজে বহু ভুল ধারণা রয়েছে। অনেক সময় পারিবারিক কলহ বা দাম্পত্য বিবাদের সুযোগ নিয়ে স্ত্রীকে জোরপূর্বক শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া বা তাঁর থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে ভারতীয় আইন অনুযায়ী, দাম্পত্য সম্পর্ক চলাকালীন অথবা বিবাদের সময়েও শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় পাওয়া এবং স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষার বিধান রাখা হয়েছে।
পারিবারিক হিংসা প্রতিরোধ আইন (Domestic Violence Act, 2005) এবং সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি আইন এই অধিকার নিশ্চিত করে।
শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রীর থাকার ও ভরণপোষণের প্রধান আইনি নিয়মাবলী:
- যৌথ ভিটা বা বাড়িতে থাকার অধিকার (Right to Shared Household): ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাক্টের ১৮ ও ১৯ ধারা অনুযায়ী, বিয়ের পর স্ত্রী যে বাড়িতে যৌথভাবে বসবাস শুরু করেন (তা শ্বশুরবাড়ির স্বার্জিত বা ভাড়াবাড়ি যা-ই হোক না কেন), সেখানে তাঁর থাকার সম্পূর্ণ আইনি অধিকার রয়েছে। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোক চাইলেই জোর করে তাঁকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে পারেন না।
- আদালতের মাধ্যমে থাকার আইনি সুরক্ষা (Residences Order): শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ভয় থাকলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে আবেদন করে 'রেসিডেন্স অর্ডার' পেতে পারেন। আদালত নির্দেশ দিলে পুলিশ প্রশাসন স্ত্রীকে সেই বাড়িতে রাখার বা উচ্ছেদ না করার সুব্যবস্থা করে।
- স্বামীর কাছে মূল ভরণপোষণের দাবি: স্ত্রীকে ভরণপোষণ (খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান) দেওয়ার প্রাথমিক ও মৌলিক দায়িত্ব স্বামীর। স্বামী উপার্জনক্ষম হলে স্ত্রী ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারা বা ডিভি অ্যাক্ট ২০ ধারার অধীনে নিয়মিত মান্থলি মেইনটেন্যান্স (Maintenance) পাওয়ার আইনি দাবিদার।
- শ্বশুরের সম্পত্তিতে আইনি অধিকারের সত্যতা: শ্বশুর জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর স্বার্জিত সম্পত্তি বা বাড়িতে পুত্রবধূর সরাসরি কোনো মালিকানা স্বত্ব থাকে না। তবে সেই বাড়ি যদি যৌথ পরিবারের বা পৈতৃক (Ancestral) সম্পত্তি হয়, তবে স্বামী মারফৎ স্ত্রীর নির্দিষ্ট অধিকার তৈরি হয়।
- বিপত্নীক বা স্বামীর মৃত্যুর পর ভরণপোষণ: স্বামীর অকালমৃত্যু হলে বা স্বামী সম্পূর্ণ অকম্পনশীল হলে, হিন্দু দত্তক ও রক্ষণাবেক্ষণ আইন (HAMA) অনুযায়ী নিঃস্ব ও উপার্জনে অক্ষম বিধবা পুত্রবধূ তাঁর শ্বশুরের কাছে (শ্বশুরের পৈতৃক সম্পত্তি থাকলে) ভরণপোষণ ও আশ্রয়ের দাবি জানাতে পারেন।
বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা ও স্ত্রীর নিরাপত্তা
পারিবারিক বিবাদের কারণে যৌথ পরিবারে একত্রে থাকা যদি স্ত্রীর সুরক্ষার জন্য বিপজ্জনক হয়, তবে আইন অনুযায়ী স্বামী স্ত্রীকে সমমানের বিকল্প বাসস্থান (Alternate Accommodation) তৈরি করে দিতে বা তার ভাড়া বহন করতে বাধ্য থাকেন।
সংক্ষেপে, স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সাথে বিরোধ দেখা দিলেই পুত্রবধূকে আইনি ভিত্তি ছাড়া বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। যেকোনো ধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন কিংবা উচ্ছেদের চেষ্টা করা হলে নারী সুরক্ষার আইনি সহায়তা কেন্দ্র বা আদালতে আবেদন জানিয়ে দ্রুত বিচারিক প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।