মেডিকেল এমার্জেন্সি ও লিভ-ইন পার্টনার: হাসপাতালে সই করার আইনি অধিকার কি সঙ্গীর থাকে?

মেডিকেল এমার্জেন্সি ও লিভ-ইন পার্টনার: হাসপাতালে সই করার আইনি অধিকার কি সঙ্গীর থাকে?

মেডিকেল এমার্জেন্সি ও লিভ-ইন সম্পর্কের আইনি রূপরেখা

দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যখন বিবাহ বন্ধনে না আবদ্ধ হয়ে লিভ-ইন সম্পর্কে বসবাস করেন, তখন জীবনের নানা জরুরি মুহূর্তে আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে কোনো কঠিন রোগ, সড়ক দুর্ঘটনা বা আকস্মিক মেডিকেল এমার্জেন্সির (Medical Emergency) ক্ষেত্রে যখন রোগী নিজে সিদ্ধান্ত নিতে বা সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে অক্ষম থাকেন, তখন হাসপাতালে অপারেশনের সংবেদনশীল ফর্মে সই কে করবেন—তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। চিকিৎসাসেবা আইন ও হাসপাতালের সাধারণ প্রশাসনিক প্রটোকল অনুযায়ী, লিভ-ইন পার্টনারের এই সংক্রান্ত আইনি অধিকার এখনো বেশ কিছু জটিলতার সম্মুখীন হয়।

ভারতে ঐতিহ্যগতভাবে হাসপাতালগুলো যেকোনো জটিল অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসার সম্মতির জন্য আইনসম্মত স্বামী/স্ত্রী বা রক্তসম্পর্কের নিকটাত্মীয়দের (Next of Kin) অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।

হাসপাতালে সম্মতি ও মেডিকেল এমার্জেন্সি সংক্রান্ত মূল আইনি দিকসমূহ:

  • হাসপাতালের প্রশাসনিক নীতি: নীতিগতভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইনসম্মত বৈবাহিক সঙ্গী বা নিকটাত্মীয়দের (বাবা-মা, সন্তান বা ভাইবোন) কাছ থেকে সম্মতি নেওয়াকে সুরক্ষিত মনে করে।
  • জরুরি জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা: সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচাতে ডাক্তারের অবিলম্বে চিকিৎসা শুরু করার আইনি অধিকার রয়েছে, সেক্ষেত্রে রোগীর সম্মতিপত্রের অপেক্ষা বাধ্যতামূলক নয়।
  • আইনি স্বীকৃতি ও প্রতিবন্ধকতা: পাসপোর্টে বা বৈবাহিক সনদে নাম না থাকা লিভ-ইন পার্টনারকে অনেক সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ "আইনি নিকটাত্মীয়" হিসেবে মানতে অনীহা প্রকাশ করে।
  • মেডিকেল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (Medical Power of Attorney): কোনো ব্যক্তি আগে থেকেই আইনি নথির মাধ্যমে লিভ-ইন পার্টনারকে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে যেতে পারেন।
  • স্বঘোষণাপত্র ও নমিনেশন: নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি স্বাস্থ্যবীমা ও হাসপাতালের ফর্মে জরুরি যোগাযোগের ব্যক্তি হিসেবে সঙ্গীর নাম উল্লেখ করা যায়।

আইনি প্রটোকল ও আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি

আইন অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিজস্ব স্বাস্থ্যের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার (Autonomy) রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট একাধিক পর্যবেক্ষণে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার অধিকার রক্ষা করেছে। তবে চিকিৎসার ঝুঁকি সংক্রান্ত নথিতে (Informed Consent Form) সই করার ক্ষেত্রে হাসপাতালগুলো কেবল মামলা-মোকদ্দমার ভয় এড়াতেই রক্তের সম্পর্ক বা বৈবাহিক আত্মীয় খোঁজে।

মেডিকেল ইমার্জেন্সিতে যদি লিভ-ইন পার্টনার ছাড়া অন্য কোনো নিকটাত্মীয় উপস্থিত না থাকেন, তবে হাসপাতাল তাঁর উপস্থিতি ও সম্মতিকে জরুরি ক্ষেত্রে গ্রহণ করতে পারে। তবে রোগীর আইনসম্মত পরিবারের সদস্যরা এসে আপত্তি জানালে চিকিৎসকদের আইনি ও প্রশাসনিক দোটানায় পড়তে হয়।

জরুরি অবস্থায় সঙ্গীর সই করার অধিকার নিশ্চিত করার উপায়

ভবিষ্যতের অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বা জরুরি পরিস্থিতিতে যাতে লিভ-ইন সঙ্গী আপনার চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তার জন্য জীবিত থাকা অবস্থায় বা সুস্থ থাকা অবস্থায় কিছু আইনি পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ।

আইনি প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:

  • মেডিকেল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (Medical Power of Attorney): একজন আইনজীবীর মাধ্যমে আইনসম্মত চুক্তিপত্র তৈরি করে সঙ্গীকে জরুরি চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ও ফর্মে সই করার আইনি কর্তৃত্ব দেওয়া।
  • লিভিং উইল (Living Will / Advance Medical Directive): সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুযায়ী নিজের চিকিৎসাপদ্ধতি এবং অক্ষম অবস্থায় কার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে—তা লিখিত ও রেজিস্ট্রি করে রাখা।
  • হাসপাতালের অ্যাডমিশন ও ইন্স্যুরেন্স ফর্ম: হেলথ ইন্স্যুরেন্স বা মেডিকেল কার্ডে "Emergency Contact Person" হিসেবে লিভ-ইন সঙ্গীর নাম ও ফোন নম্বর যুক্ত করা।
  • পরিবারকে অবহিত রাখা: আইনি বিবাদ এড়াতে উভয় পরিবারের অন্তত দু-একজন সদস্যের সাথে সুসম্পর্ক ও জরুরি যোগাযোগের সুযোগ রাখা।

সচেতন প্রস্তুতি ও সঠিক আইনি দস্তাবেজ কাছে থাকলে মেডিকেল এমার্জেন্সির মতো চরম স্পর্শকাতর মুহূর্তেও অবিবাহিত যুগলরা আইনি ও প্রশাসনিক সুবিধা পেতে পারেন।