যৌথ ঋণ (Joint Loan) এবং লিভ-ইন সম্পর্ক: ব্রেকআপের পর ঋণের টাকা পরিশোধের আইনি দায় কার?

যৌথ ঋণ (Joint Loan) এবং লিভ-ইন সম্পর্ক: ব্রেকআপের পর ঋণের টাকা পরিশোধের আইনি দায় কার?

যৌথ ঋণ ও লিভ-ইন ব্রেকআপের আইনি প্রেক্ষাপট

একসঙ্গে বসবাস করার সময় অনেক লিভ-ইন যুগল যৌথভাবে হোম লোন (Home Loan), কার লোন বা পার্সোনাল লোন নিয়ে সম্পদ ক্রয় করেন কিংবা দৈনন্দিন চাহিদা মেটান। কিন্তু সম্পর্কের টানাপোড়েনে ব্রেকআপ হয়ে গেলে ব্যাংকের এই যৌথ ঋণ (Joint Loan) পরিশোধ করা নিয়ে চরম আইনি ও আর্থিক জটিলতা দেখা দেয়। বহু ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে—সম্পর্ক ভেঙে গেলে বা একজন সঙ্গী বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে ইএমআই (EMI) মেটানোর দায়িত্ব কার? ব্যাংকিং আইন ও দেওয়ানি বিধি অনুযায়ী, ব্যাংকের কাছে যুগলের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমীকরণ বা ব্রেকআপের কোনো আইনি মূল্য নেই; ব্যাংকের একমাত্র বিচার্য বিষয় হলো ঋণ চুক্তিতে কাদের নাম রয়েছে।

ব্রেকআপের পর সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হলেও ব্যাংকের দৃষ্টিতে প্রাথমিক ঋণগ্রহীতা (Primary Applicant) এবং সহ-ঋণগ্রহীতা (Co-applicant) উভয়ই সমানভাবে দায়িত্বশীল থাকেন।

যৌথ ঋণের ক্ষেত্রে আইনি দায়বদ্ধতার মূল দিকসমূহ:

  • যৌথ ও পৃথক দায় (Joint and Several Liability): ব্যাংকিং আইনানুসারে ঋণের সম্পূর্ণ অর্থ মূল আবেদনকারী ও সহ-আবেদনকারী—উভয়ের কাছ থেকেই আদায়যোগ্য।
  • সম্পর্কের ইতি হলেও চুক্তির ইতি নয়: ব্রেকআপ বা আলাদা বসবাস শুরু করলেও ব্যাংকের ক্রেডিট এগ্রিমেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না।
  • সিবিল স্কোরে (CIBIL Score) নেতিবাচক প্রভাব: একজন সঙ্গী ইএমআই দেওয়া বন্ধ করলে উভয় সঙ্গীরই ক্রেডিট স্কোর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • আইনি নোটিশ ও রিকভারি: ঋণ খেলাপি (Default) হলে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে দুজনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে।
  • সম্পত্তির অধিকার ও দায়: সম্পত্তির যৌথ মালিকানা না থাকলেও কেবল ঋণে সহ-আবেদনকারী হিসেবে নাম থাকলে ব্যাংক টাকা আদায় করতে পারে।

ব্রেকআপের পর ঋণের টাকা পরিশোধের আইনি দায় কার?

আইন অনুযায়ী, ব্যাংক বা নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (NBFC) ঋণের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরকারী উভয় ব্যক্তিকেই সমান দায়ী মনে করে। যদি ঋণ নিয়ে কেনা সম্পত্তি (যেমন—ফ্ল্যাট বা গাড়ি) কেবল একজনের নামে থাকে কিন্তু ঋণ দুজনের যৌথ নামে হয়, তবে যার নামে সম্পত্তি নেই তিনিও ইএমআই পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত নন।

দেওয়ানি আইন অনুযায়ী, ব্রেকআপের পর যদি একজন সঙ্গী একাই সমস্ত ইএমআই পরিশোধ করতে থাকেন, তবে তিনি অপর সঙ্গীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করে তাঁর অংশের টাকা আদায় (Recovery Suit) করতে পারেন। তবে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী আইনি প্রক্রিয়া।

আর্থিক ও আইনি জটিলতা এড়াতে প্রসেস ও সমাধানের পথ

লিভ-ইন ব্রেকআপের পর যৌথ ঋণ সংক্রান্ত ঝামেলা কাটাতে এবং ক্রেডিট স্কোর সুরক্ষিত রাখতে বেশ কিছু বাস্তবিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব।

যৌথ ঋণের জটিলতা কাটানোর প্রধান সমাধান:

  • লোন ট্রান্সফার বা রিফাইন্যান্স (Loan Transfer): যেকোনো একজন সঙ্গী ঋণটি নিজের একক নামে স্থানান্তরিত করতে পারেন, যাতে অপর সঙ্গীর নাম সহ-আবেদনকারীর তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ যায়।
  • সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ: যৌথ মালিকানাধীন বাড়ি বা গাড়ি বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ব্যাংকের পুরো ঋণ মেটানো এবং উদ্বৃত্ত অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করা।
  • সেটেলমেন্ট এগ্রিমেন্ট (Financial Settlement Deed): আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিত সমঝোতাপত্র সম্পাদন করে কে কত অংশ লোন মেটাবেন বা সম্পদ নেবেন—তা স্পষ্টভাবে নিবন্ধিত করা।
  • ব্যাংককে নোটিশ দেওয়া: ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করে বৈবাহিক/সম্পর্কের পরিবর্তনের বিষয়টি জানানো এবং ঋণের পুনর্গঠন (Restructuring)-এর আবেদন করা।

যৌথ ঋণ নেওয়ার পূর্বেই লিভ-ইন চুক্তিতে (Live-in Agreement) আর্থিক দায়বদ্ধতার রূপরেখা স্পষ্ট রাখা উচিত। অনাকাঙ্ক্ষিত বিবাদ এড়াতে বা ব্যাংক রিকভারি নোটিশ পেলে অভিজ্ঞ দেওয়ানি ও ব্যাংকিং আইন বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।